০২:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাকরি নেই, দণ্ডপ্রাপ্ত—তবু তিতাসের সিবিএতে সহ-সভাপতি: নিয়োগ-পদায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতায় অনিয়মের অভিযোগ

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:৪৬:৪৬ অপরাহ্ন, রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
  • ১০০৯২ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শাহজাহান বাশার

দুর্নীতি মামলায় আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত এবং তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি থেকে চাকরিচ্যুত মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুলই তিতাস গ্যাস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন (সিবিএ) কমিটির সহ-সভাপতি পদে রয়েছেন—এমন তথ্যের পক্ষে একাধিক নথি ও তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাসের সিবিএ কমিটিতে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ও চাকরিচ্যুত কর্মচারী কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি এখন শুধু তিতাস গ্যাসের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয় নয়; বরং সিবিএ কমিটির বৈধতা, শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়মের শাসন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এ অবস্থায় বিষয়টি পেট্রোবাংলা, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ, শ্রম অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে এনে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ২০ মে ২০২৬ তারিখের অফিস আদেশে মোঃ আসাদুজ্জামান (কর্মী নম্বর-০৯১১১), সিনিয়র ইলেকট্রিশিয়ানকে চাকরি থেকে বরখাস্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিতাস গ্যাসের ওই অফিস আদেশে বলা হয়, রমনা মডেল থানার মামলা নং-০২ (০১) ২০১৯ পরবর্তীতে মেট্রোপলিটন বিশেষ দায়রা মামলা নং-৩৪৩/২০২২ এবং বিশেষ মামলা নং-০৬/২০২৩ হিসেবে পরিচালিত হয়। ঢাকার বিশেষ আদালত নং-৬ এর ৭ আগস্ট ২০২৫ তারিখের রায়ে মোঃ আসাদুজ্জামানকে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আদালতের রায়ে তাকে পৃথকভাবে তিন বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২৩(১)(ক) অনুযায়ী তাকে তিতাস গ্যাসের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং অফিস আদেশে বলা হয়, ওই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর।

অর্থাৎ নথির তথ্য অনুযায়ী, একদিকে আদালতের রায়ে দুর্নীতি মামলায় দণ্ড, অন্যদিকে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অফিস আদেশে চাকরিচ্যুতি। কিন্তু এর পরও অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-প্রমাণে জানা যায়, এই মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুলই তিতাস গ্যাস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সিবিএ কমিটিতে সহ-সভাপতি হিসেবে স্থান পেয়েছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—আদালতে দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এবং তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের আদেশে চাকরিচ্যুত একই ব্যক্তি কীভাবে আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সিবিএ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন?

এখানে বিষয়টি কেবল একই নামের কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে নয়। বরং প্রাপ্ত নথি ও তথ্য-প্রমাণে সিবিএ কমিটির সহ-সভাপতি এবং তিতাস গ্যাসের চাকরিচ্যুত কর্মচারী মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুল একই ব্যক্তি বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তার কর্মী নম্বর, পদবি, তিতাস গ্যাসের চাকরিসংক্রান্ত তথ্য এবং সিবিএ কমিটিতে থাকা পরিচয়ের মধ্যে মিল রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা গেছে। ফলে বিষয়টি এখন সিবিএ কমিটির বৈধতা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে—সিবিএ কমিটি গঠনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি জানতে পারেনি যে, ওই ব্যক্তি তিতাস গ্যাসের একজন কর্মচারী হিসেবে দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত? সিবিএ কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির সময় তার বিরুদ্ধে আদালতের রায় এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুতির বিষয়টি কি যাচাই করা হয়েছিল? চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর একজন সাবেক কর্মচারী কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বর্তমান শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকতে পারেন? আর যদি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জানা থাকে, তাহলে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিতাস গ্যাসের ২০ মে ২০২৬ তারিখের অফিস আদেশে চাকরিচ্যুতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার পরও যদি একই ব্যক্তি সিবিএ কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে বহাল থাকেন, তাহলে বিষয়টি শুধু তিতাস গ্যাসের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয় নয়; বরং সিবিএ স্বীকৃতি, শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের বিষয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের নেতৃত্বে কারা থাকবেন, তাদের যোগ্যতা কী হবে এবং কোনো সদস্য চাকরিচ্যুত হলে তার সাংগঠনিক পদ বহাল থাকার সুযোগ আছে কি না—এসব বিষয়েও সংশ্লিষ্ট বিধি ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্পষ্টতা প্রয়োজন।

প্রশ্ন আরও উঠছে—তিতাস গ্যাসের নিজস্ব নথিতে যদি ২০ মে ২০২৬ তারিখে তার চাকরিচ্যুতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে, তাহলে সিবিএ কমিটি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি এ তথ্য সম্পর্কে অবগত ছিল? অবগত থাকলে চাকরিচ্যুতির পরও তার সিবিএ পদ বহাল থাকার কারণ কী? আর অবগত না থাকলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিক সংগঠনের কমিটি গঠনের সময় সদস্যদের চাকরির বর্তমান অবস্থা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর ছিল?

তিতাস গ্যাসের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মচারীর আদালতে দণ্ডিত হওয়া এবং পরবর্তীতে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক নথিতে থাকার পরও যদি তিনি একই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন, তাহলে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ এখানে শুধু একজন ব্যক্তির পদে থাকার প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়ম ও শৃঙ্খলার প্রয়োগ সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে হচ্ছে কি না।

এ অবস্থায় পেট্রোবাংলার কাছেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—তাদের অধীনস্থ একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরিচ্যুত একজন ব্যক্তি কীভাবে শ্রমিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো পর্যালোচনা হয়েছে কি না? তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন—নিজস্ব নথিতে চাকরিচ্যুতির তথ্য থাকার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সিবিএ পদ সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে? শ্রম অধিদপ্তরের কাছে প্রশ্ন—সংশ্লিষ্ট সিবিএ কমিটির স্বীকৃতি, কমিটির সদস্য হওয়ার যোগ্যতা এবং চাকরিচ্যুত ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার বৈধতা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে? আর দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছেও প্রশ্ন—দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত একজন ব্যক্তির একই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার বিষয়টি কোনো আইনগত, প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক জটিলতার সঙ্গে যুক্ত কি না, তা কি প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করে দেখা হবে?

বিষয়টি নিয়ে তিতাস গ্যাস পিএলসির মহাব্যবস্থাপক মোঃ লুৎফর মাসুমকে অবগত করে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তার কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে তিতাস গ্যাস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন সিবিএ কমিটির সভাপতি খন্দকার জুলফিকার মতিনের কাছেও বিষয়টি অবগত করে বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। তবে তার কাছ থেকেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, দণ্ডপ্রাপ্ত ও চাকরিচ্যুত মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুলের বক্তব্য জানার জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। বরং তিতাস গ্যাসের নিজস্ব অফিস আদেশ, আদালতের রায় এবং সিবিএ কমিটিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান—এসব নথি ও তথ্যের ভিত্তিতেই প্রশ্নগুলো সামনে আনা হচ্ছে। বিষয়টির প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই, প্রয়োজনীয় তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাসে স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা জনস্বার্থের বিষয়। একজন ব্যক্তি আদালতে দণ্ডিত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের চাকরি হারিয়েও যদি একই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকেন, তাহলে এর আইনগত ও সাংগঠনিক ভিত্তি কী—তা স্পষ্ট করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

এখন পেট্রোবাংলা, তিতাস গ্যাস পিএলসি, শ্রম অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি সরাসরি প্রশ্ন—আদালতে দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এবং তিতাস গ্যাসের চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুল যখন একই ব্যক্তি হিসেবে তিতাস গ্যাস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন সিবিএ কমিটির সহ-সভাপতি পদে রয়েছেন বলে নথিতে প্রতীয়মান হচ্ছে, তখন কোন প্রক্রিয়ায় তিনি ওই পদে এলেন এবং চাকরিচ্যুতির পরও কীভাবে পদটি বহাল থাকল?

এই প্রশ্নের উত্তর এখন শুধু সংশ্লিষ্ট একজন কর্মচারী বা একটি শ্রমিক সংগঠনের কাছে নয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো, পেট্রোবাংলার তদারকি ব্যবস্থা, শ্রম অধিদপ্তরের ভূমিকা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরদারি—সবকিছুর কাছেই প্রাসঙ্গিক।

নথি-প্রমাণের আলোকে উত্থাপিত এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা, নিরপেক্ষ যাচাই এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত এখন সময়ের দাবি—এমনটাই মনে করছেন তিতাস গ্যাসের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের একাংশ।

সতর্কতাঃ এই ওয়েবসাইটে নিজস্ব সংবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম থেকে সূত্র উল্লেখপূর্বক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত কোনো সংবাদের বিষয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে অনুগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট মূল সংবাদমাধ্যমের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও ও অন্যান্য কনটেন্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, অনুলিপি, পুনঃপ্রকাশ বা প্রচার করা কপিরাইট আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

হারানোর বেদনা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর শিক্ষা-আইনজীবী হাবিবুল হক

চাকরি নেই, দণ্ডপ্রাপ্ত—তবু তিতাসের সিবিএতে সহ-সভাপতি: নিয়োগ-পদায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতায় অনিয়মের অভিযোগ

Update Time : ১২:৪৬:৪৬ অপরাহ্ন, রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬

মোঃ শাহজাহান বাশার

দুর্নীতি মামলায় আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত এবং তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি থেকে চাকরিচ্যুত মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুলই তিতাস গ্যাস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন (সিবিএ) কমিটির সহ-সভাপতি পদে রয়েছেন—এমন তথ্যের পক্ষে একাধিক নথি ও তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাসের সিবিএ কমিটিতে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ও চাকরিচ্যুত কর্মচারী কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি এখন শুধু তিতাস গ্যাসের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয় নয়; বরং সিবিএ কমিটির বৈধতা, শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়মের শাসন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এ অবস্থায় বিষয়টি পেট্রোবাংলা, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ, শ্রম অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে এনে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ২০ মে ২০২৬ তারিখের অফিস আদেশে মোঃ আসাদুজ্জামান (কর্মী নম্বর-০৯১১১), সিনিয়র ইলেকট্রিশিয়ানকে চাকরি থেকে বরখাস্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিতাস গ্যাসের ওই অফিস আদেশে বলা হয়, রমনা মডেল থানার মামলা নং-০২ (০১) ২০১৯ পরবর্তীতে মেট্রোপলিটন বিশেষ দায়রা মামলা নং-৩৪৩/২০২২ এবং বিশেষ মামলা নং-০৬/২০২৩ হিসেবে পরিচালিত হয়। ঢাকার বিশেষ আদালত নং-৬ এর ৭ আগস্ট ২০২৫ তারিখের রায়ে মোঃ আসাদুজ্জামানকে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আদালতের রায়ে তাকে পৃথকভাবে তিন বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২৩(১)(ক) অনুযায়ী তাকে তিতাস গ্যাসের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং অফিস আদেশে বলা হয়, ওই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর।

অর্থাৎ নথির তথ্য অনুযায়ী, একদিকে আদালতের রায়ে দুর্নীতি মামলায় দণ্ড, অন্যদিকে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অফিস আদেশে চাকরিচ্যুতি। কিন্তু এর পরও অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-প্রমাণে জানা যায়, এই মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুলই তিতাস গ্যাস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সিবিএ কমিটিতে সহ-সভাপতি হিসেবে স্থান পেয়েছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—আদালতে দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এবং তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের আদেশে চাকরিচ্যুত একই ব্যক্তি কীভাবে আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সিবিএ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন?

এখানে বিষয়টি কেবল একই নামের কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে নয়। বরং প্রাপ্ত নথি ও তথ্য-প্রমাণে সিবিএ কমিটির সহ-সভাপতি এবং তিতাস গ্যাসের চাকরিচ্যুত কর্মচারী মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুল একই ব্যক্তি বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তার কর্মী নম্বর, পদবি, তিতাস গ্যাসের চাকরিসংক্রান্ত তথ্য এবং সিবিএ কমিটিতে থাকা পরিচয়ের মধ্যে মিল রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা গেছে। ফলে বিষয়টি এখন সিবিএ কমিটির বৈধতা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে—সিবিএ কমিটি গঠনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি জানতে পারেনি যে, ওই ব্যক্তি তিতাস গ্যাসের একজন কর্মচারী হিসেবে দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত? সিবিএ কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির সময় তার বিরুদ্ধে আদালতের রায় এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুতির বিষয়টি কি যাচাই করা হয়েছিল? চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর একজন সাবেক কর্মচারী কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বর্তমান শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকতে পারেন? আর যদি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জানা থাকে, তাহলে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিতাস গ্যাসের ২০ মে ২০২৬ তারিখের অফিস আদেশে চাকরিচ্যুতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার পরও যদি একই ব্যক্তি সিবিএ কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে বহাল থাকেন, তাহলে বিষয়টি শুধু তিতাস গ্যাসের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয় নয়; বরং সিবিএ স্বীকৃতি, শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের বিষয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের নেতৃত্বে কারা থাকবেন, তাদের যোগ্যতা কী হবে এবং কোনো সদস্য চাকরিচ্যুত হলে তার সাংগঠনিক পদ বহাল থাকার সুযোগ আছে কি না—এসব বিষয়েও সংশ্লিষ্ট বিধি ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্পষ্টতা প্রয়োজন।

প্রশ্ন আরও উঠছে—তিতাস গ্যাসের নিজস্ব নথিতে যদি ২০ মে ২০২৬ তারিখে তার চাকরিচ্যুতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে, তাহলে সিবিএ কমিটি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি এ তথ্য সম্পর্কে অবগত ছিল? অবগত থাকলে চাকরিচ্যুতির পরও তার সিবিএ পদ বহাল থাকার কারণ কী? আর অবগত না থাকলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিক সংগঠনের কমিটি গঠনের সময় সদস্যদের চাকরির বর্তমান অবস্থা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর ছিল?

তিতাস গ্যাসের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মচারীর আদালতে দণ্ডিত হওয়া এবং পরবর্তীতে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক নথিতে থাকার পরও যদি তিনি একই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন, তাহলে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ এখানে শুধু একজন ব্যক্তির পদে থাকার প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়ম ও শৃঙ্খলার প্রয়োগ সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে হচ্ছে কি না।

এ অবস্থায় পেট্রোবাংলার কাছেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—তাদের অধীনস্থ একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরিচ্যুত একজন ব্যক্তি কীভাবে শ্রমিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো পর্যালোচনা হয়েছে কি না? তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন—নিজস্ব নথিতে চাকরিচ্যুতির তথ্য থাকার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সিবিএ পদ সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে? শ্রম অধিদপ্তরের কাছে প্রশ্ন—সংশ্লিষ্ট সিবিএ কমিটির স্বীকৃতি, কমিটির সদস্য হওয়ার যোগ্যতা এবং চাকরিচ্যুত ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার বৈধতা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে? আর দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছেও প্রশ্ন—দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত একজন ব্যক্তির একই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার বিষয়টি কোনো আইনগত, প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক জটিলতার সঙ্গে যুক্ত কি না, তা কি প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করে দেখা হবে?

বিষয়টি নিয়ে তিতাস গ্যাস পিএলসির মহাব্যবস্থাপক মোঃ লুৎফর মাসুমকে অবগত করে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তার কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে তিতাস গ্যাস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন সিবিএ কমিটির সভাপতি খন্দকার জুলফিকার মতিনের কাছেও বিষয়টি অবগত করে বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। তবে তার কাছ থেকেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, দণ্ডপ্রাপ্ত ও চাকরিচ্যুত মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুলের বক্তব্য জানার জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। বরং তিতাস গ্যাসের নিজস্ব অফিস আদেশ, আদালতের রায় এবং সিবিএ কমিটিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান—এসব নথি ও তথ্যের ভিত্তিতেই প্রশ্নগুলো সামনে আনা হচ্ছে। বিষয়টির প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই, প্রয়োজনীয় তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাসে স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা জনস্বার্থের বিষয়। একজন ব্যক্তি আদালতে দণ্ডিত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের চাকরি হারিয়েও যদি একই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকেন, তাহলে এর আইনগত ও সাংগঠনিক ভিত্তি কী—তা স্পষ্ট করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

এখন পেট্রোবাংলা, তিতাস গ্যাস পিএলসি, শ্রম অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি সরাসরি প্রশ্ন—আদালতে দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এবং তিতাস গ্যাসের চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুল যখন একই ব্যক্তি হিসেবে তিতাস গ্যাস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন সিবিএ কমিটির সহ-সভাপতি পদে রয়েছেন বলে নথিতে প্রতীয়মান হচ্ছে, তখন কোন প্রক্রিয়ায় তিনি ওই পদে এলেন এবং চাকরিচ্যুতির পরও কীভাবে পদটি বহাল থাকল?

এই প্রশ্নের উত্তর এখন শুধু সংশ্লিষ্ট একজন কর্মচারী বা একটি শ্রমিক সংগঠনের কাছে নয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো, পেট্রোবাংলার তদারকি ব্যবস্থা, শ্রম অধিদপ্তরের ভূমিকা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরদারি—সবকিছুর কাছেই প্রাসঙ্গিক।

নথি-প্রমাণের আলোকে উত্থাপিত এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা, নিরপেক্ষ যাচাই এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত এখন সময়ের দাবি—এমনটাই মনে করছেন তিতাস গ্যাসের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের একাংশ।