০৭:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অবৈধ বালু উত্তোলনে ভাঙনের শঙ্কা, যাদুকাটায় কঠোর নজরদারি

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:৫১:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
  • ৩০১১ বার পঠিত হয়েছে

আমির হোসাইন
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, দেশখ্যাত ঐতিহ্যবাহী তাহিরপুরের শিমুলবাগান সংরক্ষণ এবং যাদুকাটা নদীর তীরবর্তী অর্ধশতাধিক গ্রাম, হাট-বাজার ও স্থাপনা রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে নির্ধারিত সীমানার মধ্যে বালু উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব আদায়ে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নদীর ইজারাবহির্ভূত এলাকায় অবৈধভাবে ড্রেজার বা বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন ও নদীর পাড় কাটার বিরুদ্ধে এবার মাঠে নেমেছে প্রশাসন ও ইজারাদার কর্তৃপক্ষ।

প্রাকৃতিকভাবে বালু ও পাথরে সমৃদ্ধ সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদী-১ ও ২ বালুমহাল দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা। নদী, বালুচর ও পাথরের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর এখানে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক। নদীর তীরেই রয়েছে এশিয়াখ্যাত শিমুলবাগান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে টেন্ডারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ১০৭ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে এক বছরের জন্য যাদুকাটা নদী-১ ও ২ বালুমহাল ইজারা নেন শাহ রুবেল আহমদ ও নাছির মিয়া। তবে ইজারা সংক্রান্ত মামলাজনিত জটিলতার কারণে প্রায় পাঁচ মাস বালুমহাল দুটির রয়্যালটি আদায় করতে পারেননি ইজারাদাররা।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সার্ভেয়ার ঘটনাস্থলে গিয়ে বালুমহাল দুটির সীমানা নির্ধারণ করেন। এ সময় নির্ধারিত সীমানায় লাল নিশানা স্থাপন করে ইজারাদারদের বালুমহাল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে নির্ধারিত সীমানার মধ্যে প্রতি ঘনফুট বালু থেকে ২০ টাকা হারে রয়্যালটি আদায় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ইজারাদার কর্তৃপক্ষের দাবি, বালুমহাল দুটি চালু থাকায় স্থানীয় প্রায় ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তারা সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ড্রেজার বা বোমা মেশিন ব্যবহার না করে সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও বড় ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে না।

তবে অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. রানু মিয়া মেম্বারের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র রাতের আঁধারে ড্রেজার বা বোমা মেশিন ব্যবহার করে ইজারাকৃত বালুমহালের নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, শিমুলবাগানের পাশের নদী তীরবর্তী এলাকা, ঘাগটিয়াসহ প্রায় ২০টি গ্রামের পাড় কেটে কোটি কোটি টাকার বালু উত্তোলন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে শিমুলবাগান, নদী তীরবর্তী অর্ধশতাধিক গ্রাম, হাট-বাজার, বসতভিটা ও ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে। ইতোমধ্যে অনেক এলাকার বসতভিটা, বাজার ও ধর্মীয় স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ৬৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৭৫ জন এজাহারভুক্ত এবং ৭২০ জনকে এজাহারবহির্ভূত আসামি করা হয়েছে। এ সময় ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধ জামিনযোগ্য হওয়ায় অনেক আসামি দ্রুত জামিনে বের হয়ে পুনরায় অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদীর পাড় কাটার কাজে জড়িয়ে পড়ছে।

এ অবস্থায় অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাড় কাটা বন্ধে টাস্কফোর্স ও মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম আরও জোরদার করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিমুলবাগান ও নদী তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামগুলো রক্ষায় ইজারাদার কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে নদীতে বাঁশের বেড়া নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে।

প্রশাসন ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে অবৈধভাবে নদীর পাড় কাটা বন্ধ করা গেলে দেশের অন্যতম নান্দনিক পর্যটনকেন্দ্র শিমুলবাগান এবং যাদুকাটা নদী তীরবর্তী অর্ধশতাধিক গ্রামকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

সতর্কতাঃ এই ওয়েবসাইটে নিজস্ব সংবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম থেকে সূত্র উল্লেখপূর্বক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত কোনো সংবাদের বিষয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে অনুগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট মূল সংবাদমাধ্যমের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও ও অন্যান্য কনটেন্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, অনুলিপি, পুনঃপ্রকাশ বা প্রচার করা কপিরাইট আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

প্রায় ৫২ কোটি টাকার মাদক ধ্বংস করল বিজিবি সীমান্তে নজরদারি জোরদারে বাড়ছে ড্রোন ও সিসিটিভির ব্যবহার

অবৈধ বালু উত্তোলনে ভাঙনের শঙ্কা, যাদুকাটায় কঠোর নজরদারি

Update Time : ০২:৫১:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

আমির হোসাইন
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, দেশখ্যাত ঐতিহ্যবাহী তাহিরপুরের শিমুলবাগান সংরক্ষণ এবং যাদুকাটা নদীর তীরবর্তী অর্ধশতাধিক গ্রাম, হাট-বাজার ও স্থাপনা রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে নির্ধারিত সীমানার মধ্যে বালু উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব আদায়ে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নদীর ইজারাবহির্ভূত এলাকায় অবৈধভাবে ড্রেজার বা বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন ও নদীর পাড় কাটার বিরুদ্ধে এবার মাঠে নেমেছে প্রশাসন ও ইজারাদার কর্তৃপক্ষ।

প্রাকৃতিকভাবে বালু ও পাথরে সমৃদ্ধ সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদী-১ ও ২ বালুমহাল দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা। নদী, বালুচর ও পাথরের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর এখানে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক। নদীর তীরেই রয়েছে এশিয়াখ্যাত শিমুলবাগান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে টেন্ডারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ১০৭ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে এক বছরের জন্য যাদুকাটা নদী-১ ও ২ বালুমহাল ইজারা নেন শাহ রুবেল আহমদ ও নাছির মিয়া। তবে ইজারা সংক্রান্ত মামলাজনিত জটিলতার কারণে প্রায় পাঁচ মাস বালুমহাল দুটির রয়্যালটি আদায় করতে পারেননি ইজারাদাররা।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সার্ভেয়ার ঘটনাস্থলে গিয়ে বালুমহাল দুটির সীমানা নির্ধারণ করেন। এ সময় নির্ধারিত সীমানায় লাল নিশানা স্থাপন করে ইজারাদারদের বালুমহাল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে নির্ধারিত সীমানার মধ্যে প্রতি ঘনফুট বালু থেকে ২০ টাকা হারে রয়্যালটি আদায় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ইজারাদার কর্তৃপক্ষের দাবি, বালুমহাল দুটি চালু থাকায় স্থানীয় প্রায় ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তারা সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ড্রেজার বা বোমা মেশিন ব্যবহার না করে সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও বড় ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে না।

তবে অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. রানু মিয়া মেম্বারের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র রাতের আঁধারে ড্রেজার বা বোমা মেশিন ব্যবহার করে ইজারাকৃত বালুমহালের নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, শিমুলবাগানের পাশের নদী তীরবর্তী এলাকা, ঘাগটিয়াসহ প্রায় ২০টি গ্রামের পাড় কেটে কোটি কোটি টাকার বালু উত্তোলন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে শিমুলবাগান, নদী তীরবর্তী অর্ধশতাধিক গ্রাম, হাট-বাজার, বসতভিটা ও ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে। ইতোমধ্যে অনেক এলাকার বসতভিটা, বাজার ও ধর্মীয় স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ৬৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৭৫ জন এজাহারভুক্ত এবং ৭২০ জনকে এজাহারবহির্ভূত আসামি করা হয়েছে। এ সময় ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধ জামিনযোগ্য হওয়ায় অনেক আসামি দ্রুত জামিনে বের হয়ে পুনরায় অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদীর পাড় কাটার কাজে জড়িয়ে পড়ছে।

এ অবস্থায় অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাড় কাটা বন্ধে টাস্কফোর্স ও মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম আরও জোরদার করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিমুলবাগান ও নদী তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামগুলো রক্ষায় ইজারাদার কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে নদীতে বাঁশের বেড়া নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে।

প্রশাসন ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে অবৈধভাবে নদীর পাড় কাটা বন্ধ করা গেলে দেশের অন্যতম নান্দনিক পর্যটনকেন্দ্র শিমুলবাগান এবং যাদুকাটা নদী তীরবর্তী অর্ধশতাধিক গ্রামকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।