মোঃ শাহজাহান বাশার : দেশের দ্রুত বিকাশমান অনলাইন গণমাধ্যম খাতকে একটি সুসংগঠিত, টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্পে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সভাপতি আহমেদ আবু জাফর।
তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে দেশে অনলাইন গণমাধ্যমের পরিসর প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সম্ভাবনাময় এই খাতকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া না হলে একদিকে যেমন পেশাগত সাংবাদিকতার মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, অন্যদিকে তেমনি দায়িত্বহীন ও অপসাংবাদিকতার সুযোগও বাড়তে পারে। তাই অনলাইন গণমাধ্যমকে একটি শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পখাত হিসেবে গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময়।
আহমেদ আবু জাফর বলেন, একসময় দেশে সংবাদপত্র ও টেলিভিশনই ছিল সংবাদ পরিবেশনের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন সংবাদমাধ্যম, অনলাইন পত্রিকা, আইপি টিভি ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মানুষের কাছে তাৎক্ষণিক সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে জাতীয় দুর্যোগ, সংকট ও জরুরি পরিস্থিতিতে অনলাইন গণমাধ্যম দ্রুততম সময়ে মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে সম্ভাবনাময় এই খাতকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, দক্ষ জনবল, পেশাগত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আর্থিক ভিত্তি।
তিনি বলেন, সরকারকে দেশের সব গণমাধ্যমকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নিবন্ধনব্যবস্থা, কার্যকর নীতিমালা এবং পেশাগত মানদণ্ড নিশ্চিত করা জরুরি।
তার মতে, অনলাইন গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তথ্য যাচাই, সংবাদ উৎসের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, কপিরাইট, তথ্যের নিরাপত্তা এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতা সম্পর্কে সাংবাদিকদের দক্ষ করে তুলতে হবে।
বর্তমানে দেশে বিপুলসংখ্যক অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও আইপি টিভি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে এই খাতকে শুধু সংবাদ প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে না দেখে একটি সম্ভাবনাময় শিল্পখাত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
আহমেদ আবু জাফর বলেন, অনলাইন গণমাধ্যমের বিকল্প হিসেবে এখন আর কোনো একটি মাধ্যমকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন—সব মাধ্যমই গণমাধ্যমের বৃহত্তর পরিসরের অংশ। তাই প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অনলাইন গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। নিবন্ধিত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি যারা দীর্ঘদিন ধরে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে, তাদেরও মূল্যায়নের আওতায় আনা দরকার।
একই সঙ্গে অপসাংবাদিকতা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার ভাষায়, সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি অবিচ্ছেদ্য। যাচাই-বাছাই ছাড়া সংবাদ প্রকাশ, গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ, অতিরঞ্জিত শিরোনাম কিংবা কারও ব্যক্তিগত ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এমন সংবাদ সাংবাদিকতার নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে; একই সঙ্গে সাংবাদিকতার নামে যাতে কেউ অপসাংবাদিকতা করতে না পারে, সে বিষয়েও পেশাগত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনে সংশোধন বা প্রতিবাদ প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
আহমেদ আবু জাফর আরও বলেন, অনলাইন গণমাধ্যমকে শিল্পে রূপান্তর করা গেলে এ খাতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি ভিডিও প্রোডাকশন, গ্রাফিক ডিজাইন, ফটোগ্রাফি, তথ্যপ্রযুক্তি, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট ব্যবস্থাপনার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, সরকার, গণমাধ্যম মালিক, সাংবাদিক সংগঠন, সাংবাদিক, প্রযুক্তিবিদ, বিজ্ঞাপনদাতা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া অনলাইন গণমাধ্যমকে টেকসই শিল্পে রূপান্তর করা সম্ভব নয়।
এ জন্য অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, নৈতিক সাংবাদিকতা, স্বচ্ছ নিবন্ধনব্যবস্থা, ন্যায্য বিজ্ঞাপননীতি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আহমেদ আবু জাফর বলেন, বাংলাদেশের অনলাইন গণমাধ্যমকে শুধু সংখ্যায় নয়, মানেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। বিশ্বের উন্নত গণমাধ্যমগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে সংবাদ পরিবেশনে নির্ভুলতা, নিরপেক্ষতা, দ্রুততা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পেশাগত নৈতিকতার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল অনলাইন গণমাধ্যম শুধু সংবাদ প্রকাশ করে না; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণের মধ্যে তথ্যের সেতুবন্ধন তৈরি করে। তাই অনলাইন গণমাধ্যমের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত না করে এর জন্য একটি বাস্তবসম্মত, যুগোপযোগী ও অংশীজনভিত্তিক কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
তার মতে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণমাধ্যমের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই দেশের অনলাইন গণমাধ্যম একটি শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য শিল্পখাতে পরিণত হতে পারবে।
আহমেদ আবু জাফর সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সময়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দেশের অনলাইন গণমাধ্যম খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা ও নৈতিক মান উন্নয়নে কার্যকর প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করলে বাংলাদেশের অনলাইন গণমাধ্যম ভবিষ্যতে শুধু দেশের মানুষের কাছে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আরও বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।



















