০৮:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংবাদ নয়, বিচার হচ্ছে সাংবাদিকের!

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৩:১৬:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
  • ৩০২৫ বার পঠিত হয়েছে

মো. শাহজাহান বাশার

আমাদের সমাজে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোনো সংবাদ যদি কারও ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত অবস্থানের অনুকূলে যায়, তখন সেই সংবাদকর্মীকে বলা হয় ‘সাহসী’ বা ‘ভালো সাংবাদিক’। কিন্তু একই সাংবাদিকের সংবাদ যদি কারও স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, মুহূর্তেই তাঁর কপালে জুটে যায় ‘হলুদ সাংবাদিক’, ‘ভুয়া সাংবাদিক’, ‘বিক্রীত সাংবাদিক’—এমন নানা তকমা।

প্রশ্ন হলো, একটি সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা কি সত্যিই তথ্য-প্রমাণ দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে, নাকি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও স্বার্থের মাপকাঠিতে? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে তা শুধু সাংবাদিকতার জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই অশনিসংকেত।

আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, গণমাধ্যম অঙ্গনের ভেতরেও এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যারা পেশাদারিত্বের চেয়ে তেলবাজি, তোষামোদ কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের প্রতিযোগিতায় বেশি ব্যস্ত। কেউ কেউ নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সহজ পথ হিসেবে সহকর্মীদের ছোট করা, অপমান করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেয় করাকেই বেছে নেন। অথচ এই মানসিকতা কোনো সুস্থ সাংবাদিকতার পরিচয় বহন করে না; বরং পেশার মর্যাদাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সাংবাদিকতা কখনোই ব্যক্তিপূজার পেশা নয়। এটি সত্য অনুসন্ধানের একটি দায়িত্বশীল অঙ্গীকার। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের শক্তি তাঁর কলমে, তথ্যের নির্ভুলতায়, নৈতিকতায় এবং জনস্বার্থে অবিচল অবস্থানে। তিনি প্রশংসা বা সমালোচনার ভয়ে সত্যকে আড়াল করেন না, আবার ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকেও কাউকে লক্ষ্যবস্তু বানান না।

মনে রাখতে হবে, অন্যকে ছোট করে কখনো বড় হওয়া যায় না। সাময়িকভাবে আলোচনায় আসা সম্ভব হলেও স্থায়ী সম্মান অর্জন করা যায় না। সম্মান অর্জিত হয় সততা, বস্তুনিষ্ঠতা, শালীনতা এবং পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর আচরণ ও কর্মে, কোনো তকমায় নয়।

সংবাদ নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। প্রয়োজনে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সংবাদ খণ্ডন করা যেতে পারে, প্রতিবাদ জানানো যেতে পারে, আইনের আশ্রয়ও নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান কিংবা চরিত্রহননের সংস্কৃতি কোনো সভ্য সমাজ বা দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ভাষা হতে পারে না।

সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। আর সেই বিশ্বাসযোগ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যক্তি নয়, তথ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে; আবেগ নয়, যুক্তিকে প্রাধান্য দিতে হবে; বিভাজন নয়, পারস্পরিক সম্মান ও পেশাদারিত্বের চর্চা করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত মনে রাখা জরুরি—সংবাদকে সংবাদ হিসেবেই মূল্যায়ন করা উচিত, সাংবাদিককে নয়। কারণ সত্যের কোনো দল নেই, পক্ষ নেই; সত্য কেবল সত্যই।

সতর্কতাঃ এই ওয়েবসাইটে নিজস্ব সংবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম থেকে সূত্র উল্লেখপূর্বক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত কোনো সংবাদের বিষয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে অনুগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট মূল সংবাদমাধ্যমের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও ও অন্যান্য কনটেন্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, অনুলিপি, পুনঃপ্রকাশ বা প্রচার করা কপিরাইট আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

প্রায় ৫২ কোটি টাকার মাদক ধ্বংস করল বিজিবি সীমান্তে নজরদারি জোরদারে বাড়ছে ড্রোন ও সিসিটিভির ব্যবহার

সংবাদ নয়, বিচার হচ্ছে সাংবাদিকের!

Update Time : ০৩:১৬:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

মো. শাহজাহান বাশার

আমাদের সমাজে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোনো সংবাদ যদি কারও ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত অবস্থানের অনুকূলে যায়, তখন সেই সংবাদকর্মীকে বলা হয় ‘সাহসী’ বা ‘ভালো সাংবাদিক’। কিন্তু একই সাংবাদিকের সংবাদ যদি কারও স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, মুহূর্তেই তাঁর কপালে জুটে যায় ‘হলুদ সাংবাদিক’, ‘ভুয়া সাংবাদিক’, ‘বিক্রীত সাংবাদিক’—এমন নানা তকমা।

প্রশ্ন হলো, একটি সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা কি সত্যিই তথ্য-প্রমাণ দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে, নাকি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও স্বার্থের মাপকাঠিতে? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে তা শুধু সাংবাদিকতার জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই অশনিসংকেত।

আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, গণমাধ্যম অঙ্গনের ভেতরেও এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যারা পেশাদারিত্বের চেয়ে তেলবাজি, তোষামোদ কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের প্রতিযোগিতায় বেশি ব্যস্ত। কেউ কেউ নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সহজ পথ হিসেবে সহকর্মীদের ছোট করা, অপমান করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেয় করাকেই বেছে নেন। অথচ এই মানসিকতা কোনো সুস্থ সাংবাদিকতার পরিচয় বহন করে না; বরং পেশার মর্যাদাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সাংবাদিকতা কখনোই ব্যক্তিপূজার পেশা নয়। এটি সত্য অনুসন্ধানের একটি দায়িত্বশীল অঙ্গীকার। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের শক্তি তাঁর কলমে, তথ্যের নির্ভুলতায়, নৈতিকতায় এবং জনস্বার্থে অবিচল অবস্থানে। তিনি প্রশংসা বা সমালোচনার ভয়ে সত্যকে আড়াল করেন না, আবার ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকেও কাউকে লক্ষ্যবস্তু বানান না।

মনে রাখতে হবে, অন্যকে ছোট করে কখনো বড় হওয়া যায় না। সাময়িকভাবে আলোচনায় আসা সম্ভব হলেও স্থায়ী সম্মান অর্জন করা যায় না। সম্মান অর্জিত হয় সততা, বস্তুনিষ্ঠতা, শালীনতা এবং পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর আচরণ ও কর্মে, কোনো তকমায় নয়।

সংবাদ নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। প্রয়োজনে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সংবাদ খণ্ডন করা যেতে পারে, প্রতিবাদ জানানো যেতে পারে, আইনের আশ্রয়ও নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান কিংবা চরিত্রহননের সংস্কৃতি কোনো সভ্য সমাজ বা দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ভাষা হতে পারে না।

সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। আর সেই বিশ্বাসযোগ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যক্তি নয়, তথ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে; আবেগ নয়, যুক্তিকে প্রাধান্য দিতে হবে; বিভাজন নয়, পারস্পরিক সম্মান ও পেশাদারিত্বের চর্চা করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত মনে রাখা জরুরি—সংবাদকে সংবাদ হিসেবেই মূল্যায়ন করা উচিত, সাংবাদিককে নয়। কারণ সত্যের কোনো দল নেই, পক্ষ নেই; সত্য কেবল সত্যই।