
মোঃ শাহজাহান বাশার
এক সময় সংবাদ জানার প্রধান মাধ্যম ছিল সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশন। এখন সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। হাতে থাকা স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সংযোগই যেন পৃথিবীর সব খবরের জানালা। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, এক্স (সাবেক টুইটার), ইনস্টাগ্রাম কিংবা মেসেঞ্জার—এসব প্ল্যাটফর্ম এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এগুলো সংবাদ, মতামত, বিনোদন, ব্যবসা, শিক্ষা এবং সামাজিক আন্দোলনের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই শক্তির পাশাপাশি তৈরি হয়েছে এক নতুন সংকট—অবাধ তথ্যপ্রবাহের আড়ালে গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তির বিস্তার। ফলে প্রশ্ন জাগে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি সত্যিই তথ্যের স্বাধীনতার প্রতীক, নাকি এটি ধীরে ধীরে গুজবের কারখানায় পরিণত হচ্ছে?
ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের কণ্ঠকে শক্তিশালী করেছে। আগে যেখানে সাধারণ মানুষের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ সীমিত ছিল, এখন একটি পোস্ট, ভিডিও বা লাইভ সম্প্রচার মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কোনো দুর্যোগ, দুর্ঘটনা কিংবা সামাজিক অন্যায়ের ঘটনা অনেক সময় মূলধারার গণমাধ্যমের আগেই সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা জনদুর্ভোগের অনেক তথ্য সাধারণ নাগরিকের তোলা ছবি বা ভিডিওর মাধ্যমে সামনে এসেছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নাগরিক সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশেও এর ইতিবাচক প্রভাব কম নয়। শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা, শিল্পী, লেখক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের কাজের পরিধি বাড়াচ্ছেন। অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং কিংবা কনটেন্ট নির্মাণ—এসব ক্ষেত্র বহু তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসচেতনতা, পরিবেশ রক্ষা, রক্তদান, মানবিক সহায়তা কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অসংখ্য ইতিবাচক উদ্যোগের জন্ম দিয়েছে।
কিন্তু এই উজ্জ্বল ছবির অন্য পাশটিও কম উদ্বেগজনক নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তথ্য যাচাইয়ের অভাব। যে কেউ যেকোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে দিতে পারে। অনেক সময় পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়, আবার অনেক ভিডিও সম্পাদনা করে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হয়। অসত্য তথ্য এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে সত্য প্রকাশ পাওয়ার আগেই মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক কিংবা ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
বিশ্বজুড়েই দেখা গেছে, ভুয়া তথ্য শুধু সামাজিক বিভ্রান্তিই নয়, কখনো কখনো সহিংসতারও কারণ হয়েছে। গুজবের কারণে ব্যক্তি, পরিবার কিংবা পুরো সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি যাচাইবিহীন পোস্ট মানুষের সম্মানহানি ঘটাতে পারে, ব্যবসা ধ্বংস করতে পারে কিংবা সামাজিক সম্প্রীতিতে আঘাত হানতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আগে শেয়ার, পরে যাচাই’—এই প্রবণতা আজ সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
আরও একটি সমস্যা হলো অ্যালগরিদমনির্ভর তথ্যপ্রবাহ। অধিকাংশ প্ল্যাটফর্ম এমন কনটেন্টকেই বেশি ছড়িয়ে দেয়, যা মানুষের আবেগকে উসকে দেয়। ফলে উত্তেজনাপূর্ণ, বিতর্কিত কিংবা বিভ্রান্তিকর বিষয় দ্রুত ভাইরাল হয়, অথচ নির্ভুল ও ভারসাম্যপূর্ণ তথ্য তুলনামূলক কম মানুষের কাছে পৌঁছায়। এতে সমাজে বিভাজন বাড়ে, মতভিন্নতার প্রতি সহনশীলতা কমে এবং মানুষ নিজেদের মতের সঙ্গে মিল থাকা তথ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব গভীর। একদিকে তারা নতুন জ্ঞান, দক্ষতা ও বিশ্বসংযোগের সুযোগ পাচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত আসক্তি, ভুয়া তথ্য, সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা এবং মানসিক চাপের শিকার হচ্ছে। অনেকেই না বুঝেই ভুয়া তথ্য প্রচার করছেন, আবার কেউ কেউ জনপ্রিয়তার আশায় দায়িত্বজ্ঞানহীন কনটেন্ট তৈরি করছেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক সমস্যাতেও রূপ নিচ্ছে।
তবে এই সমস্যার জন্য শুধু প্রযুক্তিকে দোষ দিলে চলবে না। প্রযুক্তি একটি মাধ্যম মাত্র; এর ব্যবহার নির্ভর করে মানুষের ওপর। যেমন একটি বই জ্ঞানও দিতে পারে, আবার ভুল তথ্যও ছড়াতে পারে—ঠিক তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য অনুযায়ী ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। তাই সমাধানের প্রথম ধাপ হলো সচেতনতা।
প্রথমত, প্রতিটি ব্যবহারকারীর উচিত কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার উৎস যাচাই করা। কোনো ছবি, ভিডিও বা সংবাদ কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিশ্চিত না হয়ে প্রচার করা উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটাল সাক্ষরতা বা ডিজিটাল লিটারেসিকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা অনলাইন তথ্য বিশ্লেষণ ও যাচাই করার দক্ষতা অর্জন করে। তৃতীয়ত, পরিবারকেও সন্তানদের দায়িত্বশীল সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। ভুয়া অ্যাকাউন্ট, বিভ্রান্তিকর তথ্য, প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন এবং ঘৃণামূলক বক্তব্য দ্রুত শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে এটি করতে গিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন অযথা ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাধীন মতপ্রকাশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দায়িত্বশীল মতপ্রকাশও সমান অপরিহার্য।
সরকার, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজ—সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে কেবল আইন করে গুজব বন্ধ করা যাবে না; প্রয়োজন তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং সচেতন নাগরিক তৈরি করা।
সবশেষে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে ভালো বা খারাপ নয়। এটি এমন একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা যেমন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, জ্ঞান বিস্তার ও মানবিক উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে পারে, তেমনি অসচেতন ব্যবহার, গুজব ও অপপ্রচারের মাধ্যমে সমাজে অস্থিরতাও সৃষ্টি করতে পারে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আবেগের নয়, বিবেকের সঙ্গে ব্যবহার করা। কারণ একটি দায়িত্বশীল ক্লিক যেমন সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, তেমনি একটি যাচাইবিহীন শেয়ারও অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ডিজিটাল যুগে তথ্যের স্বাধীনতা অবশ্যই একটি বড় অর্জন। কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে যদি দায়িত্ববোধ, সত্য যাচাই এবং নৈতিকতার সমন্বয় না ঘটে, তবে স্বাধীনতার সেই শক্তিই গুজবের অস্ত্রে পরিণত হবে। তাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর নয়, সচেতনতানির্ভর একটি ডিজিটাল সমাজ—যেখানে তথ্য হবে সত্যের বাহক, বিভ্রান্তির নয়।






















