০৩:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাদকের জোয়ারে ভাসছে কুমিল্লা: সীমান্ত পেরিয়ে গাঁজা-ইয়াবা-মদ, মহানগরে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়ংকর নেশার ফাঁদ

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:৩৯:০২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২ আগস্ট ২০২৫
  • ৩০৭২ বার পঠিত হয়েছে

 

মোঃ শাহজাহান বাশার, স্টাফ রিপোর্টার

কুমিল্লা এখন মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। জেলার ৫টি উপজেলার ১০৩ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত ভারত সীমান্ত এখন মাদক প্রবেশের প্রধান রুটে রূপ নিয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল ও কড়া নজরদারির মাঝেও প্রতিদিন এই পথ ধরে আসছে ভয়ঙ্কর সব নেশাজাতীয় দ্রব্য—গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, বিদেশি মদ।

বিশেষ করে কুমিল্লা মহানগরের গলি-মহল্লা, অলিগলি, শহরতলির সংযোগস্থল এবং গোমতি নদীর দুই পাড়ে প্রকাশ্যেই মাদক ব্যবসা চালানো হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এসব এলাকায় রাত-বিরাতে চলে মাদক কেনাবেচা। প্রশাসনের নজর এড়িয়ে, অনেক সময় প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তার সহযোগিতায় এই চক্র দিনকে দিন আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে।

কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ, চৌদ্দগ্রাম, ব্রাহ্মণপাড়া এবং মুরাদনগর উপজেলাগুলোর ভারত সীমান্ত লাগোয়া অংশগুলো হয়ে উঠেছে মাদক পাচারের অন্যতম রুট। ভারত থেকে ট্রান্সফার পয়েন্টে আসা মাদকদ্রব্য প্রথমে সীমান্তবর্তী গ্রামে মজুত করা হয়, এরপর সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয় কুমিল্লার মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।

গোমতি নদীর দুই পাড়ে প্রতিদিনই বসছে ‘মিনি-মাদক হাট’। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যার পরপরই কিছু স্পটে গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রি হয় প্রকাশ্যে। কিছু মাদক কারবারি আবার নিজেদের ‘স্থানীয় প্রভাবশালী’ পরিচয় দিয়ে দাপটের সঙ্গে এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

মহানগরের কান্দিরপাড়, টমছম ব্রিজ, ধর্মসাগর, রেইসকোর্স, বাসস্ট্যান্ড, চর্থা, ঝাউতলা, শাসনগাছা, কালিরবাজার, বাদুরতলা, কোটবাড়ি—প্রায় প্রত্যেকটি এলাকাতেই গড়ে উঠেছে একাধিক মাদক স্পট। এসব স্পটে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। পুলিশ মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। অনেক সময় অভিযানের আগে মাদক ব্যবসায়ীরা আগাম সতর্কবার্তা পেয়ে যায়, ফলে অভিযানও হয় নিষ্ফল।

এই মাদক ছড়িয়ে পড়ার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—তরুণ ও কিশোরদের মধ্যে মাদকের বিস্তার। অনেক স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী গাঁজা ও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। তারা কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। শহরের অভিভাবক মহল চরম উদ্বিগ্ন।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তারে প্রশাসনের উদাসীনতা এবং একশ্রেণির দুর্নীতিপরায়ণ সদস্যের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা রয়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় মাদক ব্যবসা রমরমা হয়ে উঠছে।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। কিছু ক্ষেত্রে তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় অভিযান সফল হয় না। তবে মাদক নির্মূলে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে।”

অন্যদিকে বিজিবির এক কর্মকর্তা জানান, “সীমান্তে নজরদারি ও চোরাচালান প্রতিরোধে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিছু সীমান্তপথ দুর্গম হওয়ায় চোরাচালানকারীরা সুযোগ নেয়। তবে যেকোনো মূল্যে আমরা এই প্রবাহ রোধে কাজ করে যাচ্ছি।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুমিল্লা জেলার সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং তরুণ সমাজের মধ্যে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমেই এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব।

একজন অভিভাবক বলেন, “আমার ছেলেটা ১৬ বছর বয়সে গাঁজা ধরেছে। এখন কোর্ট-কাছারি করছি। সরকার যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে একসময়ের কুমিল্লা মেধার শহর এখন ‘মাদকের রাজধানী’তে পরিণত হবে।”

সতর্কতাঃ এই ওয়েবসাইটে নিজস্ব সংবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম থেকে সূত্র উল্লেখপূর্বক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত কোনো সংবাদের বিষয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে অনুগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট মূল সংবাদমাধ্যমের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও ও অন্যান্য কনটেন্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, অনুলিপি, পুনঃপ্রকাশ বা প্রচার করা কপিরাইট আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় পুকুর থেকে যুবকের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার

মাদকের জোয়ারে ভাসছে কুমিল্লা: সীমান্ত পেরিয়ে গাঁজা-ইয়াবা-মদ, মহানগরে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়ংকর নেশার ফাঁদ

Update Time : ১১:৩৯:০২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২ আগস্ট ২০২৫

 

মোঃ শাহজাহান বাশার, স্টাফ রিপোর্টার

কুমিল্লা এখন মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। জেলার ৫টি উপজেলার ১০৩ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত ভারত সীমান্ত এখন মাদক প্রবেশের প্রধান রুটে রূপ নিয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল ও কড়া নজরদারির মাঝেও প্রতিদিন এই পথ ধরে আসছে ভয়ঙ্কর সব নেশাজাতীয় দ্রব্য—গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, বিদেশি মদ।

বিশেষ করে কুমিল্লা মহানগরের গলি-মহল্লা, অলিগলি, শহরতলির সংযোগস্থল এবং গোমতি নদীর দুই পাড়ে প্রকাশ্যেই মাদক ব্যবসা চালানো হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এসব এলাকায় রাত-বিরাতে চলে মাদক কেনাবেচা। প্রশাসনের নজর এড়িয়ে, অনেক সময় প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তার সহযোগিতায় এই চক্র দিনকে দিন আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে।

কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ, চৌদ্দগ্রাম, ব্রাহ্মণপাড়া এবং মুরাদনগর উপজেলাগুলোর ভারত সীমান্ত লাগোয়া অংশগুলো হয়ে উঠেছে মাদক পাচারের অন্যতম রুট। ভারত থেকে ট্রান্সফার পয়েন্টে আসা মাদকদ্রব্য প্রথমে সীমান্তবর্তী গ্রামে মজুত করা হয়, এরপর সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয় কুমিল্লার মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।

গোমতি নদীর দুই পাড়ে প্রতিদিনই বসছে ‘মিনি-মাদক হাট’। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যার পরপরই কিছু স্পটে গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রি হয় প্রকাশ্যে। কিছু মাদক কারবারি আবার নিজেদের ‘স্থানীয় প্রভাবশালী’ পরিচয় দিয়ে দাপটের সঙ্গে এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

মহানগরের কান্দিরপাড়, টমছম ব্রিজ, ধর্মসাগর, রেইসকোর্স, বাসস্ট্যান্ড, চর্থা, ঝাউতলা, শাসনগাছা, কালিরবাজার, বাদুরতলা, কোটবাড়ি—প্রায় প্রত্যেকটি এলাকাতেই গড়ে উঠেছে একাধিক মাদক স্পট। এসব স্পটে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। পুলিশ মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। অনেক সময় অভিযানের আগে মাদক ব্যবসায়ীরা আগাম সতর্কবার্তা পেয়ে যায়, ফলে অভিযানও হয় নিষ্ফল।

এই মাদক ছড়িয়ে পড়ার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—তরুণ ও কিশোরদের মধ্যে মাদকের বিস্তার। অনেক স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী গাঁজা ও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। তারা কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। শহরের অভিভাবক মহল চরম উদ্বিগ্ন।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তারে প্রশাসনের উদাসীনতা এবং একশ্রেণির দুর্নীতিপরায়ণ সদস্যের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা রয়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় মাদক ব্যবসা রমরমা হয়ে উঠছে।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। কিছু ক্ষেত্রে তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় অভিযান সফল হয় না। তবে মাদক নির্মূলে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে।”

অন্যদিকে বিজিবির এক কর্মকর্তা জানান, “সীমান্তে নজরদারি ও চোরাচালান প্রতিরোধে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিছু সীমান্তপথ দুর্গম হওয়ায় চোরাচালানকারীরা সুযোগ নেয়। তবে যেকোনো মূল্যে আমরা এই প্রবাহ রোধে কাজ করে যাচ্ছি।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুমিল্লা জেলার সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং তরুণ সমাজের মধ্যে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমেই এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব।

একজন অভিভাবক বলেন, “আমার ছেলেটা ১৬ বছর বয়সে গাঁজা ধরেছে। এখন কোর্ট-কাছারি করছি। সরকার যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে একসময়ের কুমিল্লা মেধার শহর এখন ‘মাদকের রাজধানী’তে পরিণত হবে।”