০৮:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সামান্য অর্থের কাছে কি হারিয়ে যাচ্ছে সাংবাদিকতার মর্যাদা?

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:৪০:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
  • ৩০১৬ বার পঠিত হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদন

সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশার নাম নয়; এটি একটি দায়িত্ব, একটি অঙ্গীকার এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সমাজের প্রতিটি অন্যায়, দুর্নীতি, অনিয়ম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের হয়ে কথা বলার যে সাহস, তার নামই সাংবাদিকতা। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকা তাই সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে চলে আসছে—কিছু সাংবাদিক কি সামান্য অর্থ, ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা ক্ষণস্থায়ী লাভের কাছে নিজেদের পেশাগত মর্যাদা ও নৈতিকতা বিসর্জন দিচ্ছেন?

এ প্রশ্নটি পুরো সাংবাদিক সমাজের বিরুদ্ধে নয়। কারণ আজও অসংখ্য সাংবাদিক আছেন, যারা সীমাহীন ঝুঁকি, অল্প বেতন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্য প্রকাশের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের সততা, সাহস ও ত্যাগের কারণেই সাংবাদিকতা এখনও মানুষের আস্থার জায়গা হিসেবে টিকে আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, কিছু অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ড পুরো পেশাটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

আজকাল এমন অভিযোগ শোনা যায় যে, কোথাও অনিয়মের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে কিছু ব্যক্তি সংবাদ প্রকাশের পরিবর্তে সমঝোতার পথ বেছে নেন। কোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম তুলে ধরার বদলে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও মাঝেমধ্যে সামনে আসে। আবার কোথাও সংবাদকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও ওঠে। এসব ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক। কারণ একজন ব্যক্তির অনৈতিক আচরণের দায় শেষ পর্যন্ত পুরো সাংবাদিক সমাজকেই বহন করতে হয়।

সাংবাদিকতার শক্তি কলমে নয়, বিশ্বাসযোগ্যতায়। একজন সাংবাদিক যখন অর্থ বা প্রভাবের কাছে আপস করেন, তখন তিনি শুধু নিজের সম্মানই নষ্ট করেন না; তিনি মানুষের বিশ্বাসকেও আঘাত করেন। আর একবার সেই বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেলে সেটি পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।

অর্থ অবশ্যই জীবনের প্রয়োজন। সাংবাদিকরাও এর ব্যতিক্রম নন। কিন্তু অর্থ উপার্জনের জন্য যদি সত্যকে বিকৃত করা হয়, যদি অন্যায়কে আড়াল করা হয় কিংবা মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে সেটি আর সাংবাদিকতা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে পেশার অপব্যবহার।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে যে কেউ নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে পারছেন। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা বা পেশাগত দায়বদ্ধতা ছাড়াই অনেকেই সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করছেন। এর ফলে প্রকৃত সাংবাদিকদের পাশাপাশি কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিও এই পরিচয়কে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করছেন। এ প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি।

সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষের আস্থা। একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার গণমাধ্যম সত্যের পক্ষে নির্ভীক থাকে। তাই সাংবাদিকদের উচিত নিজেদের আত্মসমালোচনা করা, পেশাগত নৈতিকতাকে আরও শক্তিশালী করা এবং অসাধু চর্চার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া। কারণ সাংবাদিক সমাজের ভেতরের দুর্নীতি সাংবাদিকদেরই প্রতিরোধ করতে হবে।

গণমাধ্যম মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে। সাংবাদিকদের জন্য ন্যায্য কর্মপরিবেশ, যথাযথ সম্মানী, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং কঠোর নৈতিক আচরণবিধি নিশ্চিত করা গেলে অনেক অনিয়ম কমে আসবে। একই সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকতা কোনো ব্যবসা নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন সততা, সাহস, নিষ্ঠা এবং ন্যায়বোধ। সামান্য অর্থ কিংবা ক্ষণিকের সুবিধার জন্য যদি একজন সাংবাদিক নিজের বিবেককে বিসর্জন দেন, তাহলে তিনি হয়তো কিছু অর্থ অর্জন করতে পারবেন, কিন্তু হারাবেন আজীবনের সম্মান।

তবে আশার কথা হলো—বাংলাদেশে এখনও অধিকাংশ সাংবাদিক সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের ত্যাগ, সাহস এবং পেশাগত সততাই এই পেশার প্রকৃত পরিচয়। তাই কয়েকজনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড দিয়ে পুরো সাংবাদিক সমাজকে বিচার করা কখনোই ন্যায়সংগত নয়। বরং যারা পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছে, তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াই প্রকৃত সাংবাদিকতার দাবি।

সত্য কখনো বিক্রি হয় না। বিবেকেরও কোনো মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সততা, আর সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস অটুট থাকুক—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা। কারণ সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা করা মানেই সমাজের সত্য, ন্যায় ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করা।

লেখক পরিচিতিঃ  মোঃ শাহজাহান বাশার ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট , সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক জনতার মতামত ,প্রকাশক দৈনিক সরেজমিন ও নির্বাহী সম্পাদক দৈনিক যুগান্তর বাংলাদেশ 

সতর্কতাঃ এই ওয়েবসাইটে নিজস্ব সংবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম থেকে সূত্র উল্লেখপূর্বক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত কোনো সংবাদের বিষয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে অনুগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট মূল সংবাদমাধ্যমের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও ও অন্যান্য কনটেন্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, অনুলিপি, পুনঃপ্রকাশ বা প্রচার করা কপিরাইট আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

প্রায় ৫২ কোটি টাকার মাদক ধ্বংস করল বিজিবি সীমান্তে নজরদারি জোরদারে বাড়ছে ড্রোন ও সিসিটিভির ব্যবহার

সামান্য অর্থের কাছে কি হারিয়ে যাচ্ছে সাংবাদিকতার মর্যাদা?

Update Time : ১১:৪০:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদন

সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশার নাম নয়; এটি একটি দায়িত্ব, একটি অঙ্গীকার এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সমাজের প্রতিটি অন্যায়, দুর্নীতি, অনিয়ম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের হয়ে কথা বলার যে সাহস, তার নামই সাংবাদিকতা। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকা তাই সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে চলে আসছে—কিছু সাংবাদিক কি সামান্য অর্থ, ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা ক্ষণস্থায়ী লাভের কাছে নিজেদের পেশাগত মর্যাদা ও নৈতিকতা বিসর্জন দিচ্ছেন?

এ প্রশ্নটি পুরো সাংবাদিক সমাজের বিরুদ্ধে নয়। কারণ আজও অসংখ্য সাংবাদিক আছেন, যারা সীমাহীন ঝুঁকি, অল্প বেতন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্য প্রকাশের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের সততা, সাহস ও ত্যাগের কারণেই সাংবাদিকতা এখনও মানুষের আস্থার জায়গা হিসেবে টিকে আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, কিছু অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ড পুরো পেশাটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

আজকাল এমন অভিযোগ শোনা যায় যে, কোথাও অনিয়মের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে কিছু ব্যক্তি সংবাদ প্রকাশের পরিবর্তে সমঝোতার পথ বেছে নেন। কোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম তুলে ধরার বদলে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও মাঝেমধ্যে সামনে আসে। আবার কোথাও সংবাদকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও ওঠে। এসব ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক। কারণ একজন ব্যক্তির অনৈতিক আচরণের দায় শেষ পর্যন্ত পুরো সাংবাদিক সমাজকেই বহন করতে হয়।

সাংবাদিকতার শক্তি কলমে নয়, বিশ্বাসযোগ্যতায়। একজন সাংবাদিক যখন অর্থ বা প্রভাবের কাছে আপস করেন, তখন তিনি শুধু নিজের সম্মানই নষ্ট করেন না; তিনি মানুষের বিশ্বাসকেও আঘাত করেন। আর একবার সেই বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেলে সেটি পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।

অর্থ অবশ্যই জীবনের প্রয়োজন। সাংবাদিকরাও এর ব্যতিক্রম নন। কিন্তু অর্থ উপার্জনের জন্য যদি সত্যকে বিকৃত করা হয়, যদি অন্যায়কে আড়াল করা হয় কিংবা মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে সেটি আর সাংবাদিকতা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে পেশার অপব্যবহার।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে যে কেউ নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে পারছেন। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা বা পেশাগত দায়বদ্ধতা ছাড়াই অনেকেই সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করছেন। এর ফলে প্রকৃত সাংবাদিকদের পাশাপাশি কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিও এই পরিচয়কে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করছেন। এ প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি।

সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষের আস্থা। একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার গণমাধ্যম সত্যের পক্ষে নির্ভীক থাকে। তাই সাংবাদিকদের উচিত নিজেদের আত্মসমালোচনা করা, পেশাগত নৈতিকতাকে আরও শক্তিশালী করা এবং অসাধু চর্চার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া। কারণ সাংবাদিক সমাজের ভেতরের দুর্নীতি সাংবাদিকদেরই প্রতিরোধ করতে হবে।

গণমাধ্যম মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে। সাংবাদিকদের জন্য ন্যায্য কর্মপরিবেশ, যথাযথ সম্মানী, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং কঠোর নৈতিক আচরণবিধি নিশ্চিত করা গেলে অনেক অনিয়ম কমে আসবে। একই সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকতা কোনো ব্যবসা নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন সততা, সাহস, নিষ্ঠা এবং ন্যায়বোধ। সামান্য অর্থ কিংবা ক্ষণিকের সুবিধার জন্য যদি একজন সাংবাদিক নিজের বিবেককে বিসর্জন দেন, তাহলে তিনি হয়তো কিছু অর্থ অর্জন করতে পারবেন, কিন্তু হারাবেন আজীবনের সম্মান।

তবে আশার কথা হলো—বাংলাদেশে এখনও অধিকাংশ সাংবাদিক সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের ত্যাগ, সাহস এবং পেশাগত সততাই এই পেশার প্রকৃত পরিচয়। তাই কয়েকজনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড দিয়ে পুরো সাংবাদিক সমাজকে বিচার করা কখনোই ন্যায়সংগত নয়। বরং যারা পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছে, তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াই প্রকৃত সাংবাদিকতার দাবি।

সত্য কখনো বিক্রি হয় না। বিবেকেরও কোনো মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সততা, আর সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস অটুট থাকুক—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা। কারণ সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা করা মানেই সমাজের সত্য, ন্যায় ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করা।

লেখক পরিচিতিঃ  মোঃ শাহজাহান বাশার ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট , সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক জনতার মতামত ,প্রকাশক দৈনিক সরেজমিন ও নির্বাহী সম্পাদক দৈনিক যুগান্তর বাংলাদেশ