১১:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেরাজ: বিশ্বাসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক অলৌকিক সত্য

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:০২:২১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
  • ৩১০৪ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শাহজাহান বাশার

মানুষ যখন যুক্তির সীমায় এসে থমকে যায়, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় ঈমানের রাজত্ব। মেরাজ এমনই এক সত্য, যা চোখে দেখা নয়—বরং হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করার বিষয়। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মেরাজ সফর ইতিহাসের কোনো কল্পকাহিনি নয়; এটি আল্লাহর কুদরতের বাস্তব প্রকাশ, যা যুগে যুগে মুমিনদের ঈমানকে শক্তিশালী করে এসেছে।

মেরাজের রাতে মহানবী (সা.) শুধু দুনিয়া থেকে আসমানে ভ্রমণ করেননি—তিনি মানবজাতিকে নিয়ে গেছেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে পৌঁছানো সম্ভব শুধু আল্লাহর অনুগ্রহে। এই সফরে তিনি ফেরেশতাদের সরদার হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে তাঁর প্রকৃত রূপে প্রত্যক্ষ করেন। ছয় শত ডানার বিশালতায় তিনি বুঝিয়ে দেন—আল্লাহর সৃষ্টি মানুষের কল্পনার চেয়েও অসীম।

এই অলৌকিক সফরের বাহন ছিল জান্নাতি ‘বুরাক’। সময় ও দূরত্বের সমস্ত প্রচলিত ধারণাকে অতিক্রম করে মুহূর্তেই মক্কা থেকে বাইতুল মোকাদ্দাসে পৌঁছে যাওয়া—এ ঘটনা আধুনিক বিজ্ঞানের যুগেও মানুষকে বিস্মিত করে। অথচ আল্লাহর জন্য এটি কোনো অসম্ভব কিছু নয়।

বাইতুল মোকাদ্দাসে নবীজি (সা.) যখন সব নবী-রাসূলকে নিয়ে নামাজ আদায় করেন, তখন একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়—ইসলাম কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্ম নয়, বরং সব নবীর শিক্ষা ও তাওহিদের চূড়ান্ত রূপ। এখানে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ইমামতি প্রমাণ করে—নবুয়তের সিলসিলার পূর্ণতা তাঁর মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে।

সাত আসমানে একে একে নবীদের সাথে সাক্ষাৎ ছিল শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং প্রত্যেক নবীর জীবনসংগ্রাম, ধৈর্য ও ত্যাগের ধারাবাহিকতা নবীজি (সা.)-এর সামনে তুলে ধরা। আদম (আ.) থেকে ইব্রাহিম (আ.)—প্রত্যেকেই যেন সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন, সত্যের পথে চলা কখনো সহজ নয়, কিন্তু পরিণতি সর্বদা সম্মানজনক।

বায়তুল মামুরে প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতার ইবাদত মানুষের ইবাদতের তুলনাকে নগণ্য করে দেয়। এখানেই মানুষ উপলব্ধি করতে পারে—আল্লাহর দরবারে ফেরেশতা ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও, ইবাদতে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই।

‘সিদরাতুল মুনতাহা’—এই নামটি নিজেই এক গভীর তাৎপর্য বহন করে। এটি সেই সীমা, যেখানে সৃষ্টির জ্ঞান থেমে যায়। নবীজি (সা.)-এর এই পর্যায়ে পৌঁছানো প্রমাণ করে—আল্লাহ তাঁকে এমন মর্যাদা দিয়েছেন, যা আর কোনো সৃষ্টিকে দেননি।

জান্নাতের সৌন্দর্য আর কাউসার নদীর বর্ণনা মানুষের মনে আশার আলো জ্বালায়। কিন্তু একই সঙ্গে মেরাজের সফরে দেখানো শাস্তিগুলো ভয় ধরিয়ে দেয়। গীবতকারী, ভণ্ড বক্তা, সুদখোরদের ভয়াবহ পরিণতি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়—ইসলাম শুধু বিশ্বাসের নাম নয়, বরং চরিত্র ও আচরণের ধর্ম।

জাহান্নামের প্রহরী মালিক (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—শাস্তি কোনো কল্পনা নয়, এটি বাস্তব। আর সেই বাস্তবতা থেকে বাঁচার একমাত্র পথ আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা।

মেরাজের সবচেয়ে বড় উপহার—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। এটি কোনো সাধারণ বিধান নয়; এটি এমন এক ইবাদত, যা সরাসরি আসমান থেকে দেওয়া হয়েছে। নামাজ মুমিনের মেরাজ—এই কথার গভীরতা এখানেই।

আজকের অস্থির, স্বার্থপর ও মূল্যবোধহীন সমাজে মেরাজ আমাদের ডাক দেয় আত্মসমালোচনার দিকে। আমরা কি নামাজকে বোঝা মনে করছি? আমরা কি মুখে ভালো বলছি, কাজে তার বিপরীত করছি? যদি তাই হয়, তবে মেরাজ আমাদের জন্য শুধু গল্পই থেকে যাবে—শিক্ষা নয়।

মেরাজ আমাদের শেখায়—আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে হলে হৃদয়কে পরিষ্কার করতে হবে, আমলকে ঠিক করতে হবে, আর দুনিয়ার মোহের শিকল ভাঙতে হবে।

তথ্যসূত্র:
সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিজী ও নির্ভরযোগ্য সীরাত গ্রন্থ।

সতর্কতাঃ এই ওয়েবসাইটে নিজস্ব সংবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম থেকে সূত্র উল্লেখপূর্বক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত কোনো সংবাদের বিষয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে অনুগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট মূল সংবাদমাধ্যমের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও ও অন্যান্য কনটেন্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, অনুলিপি, পুনঃপ্রকাশ বা প্রচার করা কপিরাইট আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

প্রায় ৫২ কোটি টাকার মাদক ধ্বংস করল বিজিবি সীমান্তে নজরদারি জোরদারে বাড়ছে ড্রোন ও সিসিটিভির ব্যবহার

মেরাজ: বিশ্বাসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক অলৌকিক সত্য

Update Time : ১০:০২:২১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬

মোঃ শাহজাহান বাশার

মানুষ যখন যুক্তির সীমায় এসে থমকে যায়, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় ঈমানের রাজত্ব। মেরাজ এমনই এক সত্য, যা চোখে দেখা নয়—বরং হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করার বিষয়। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মেরাজ সফর ইতিহাসের কোনো কল্পকাহিনি নয়; এটি আল্লাহর কুদরতের বাস্তব প্রকাশ, যা যুগে যুগে মুমিনদের ঈমানকে শক্তিশালী করে এসেছে।

মেরাজের রাতে মহানবী (সা.) শুধু দুনিয়া থেকে আসমানে ভ্রমণ করেননি—তিনি মানবজাতিকে নিয়ে গেছেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে পৌঁছানো সম্ভব শুধু আল্লাহর অনুগ্রহে। এই সফরে তিনি ফেরেশতাদের সরদার হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে তাঁর প্রকৃত রূপে প্রত্যক্ষ করেন। ছয় শত ডানার বিশালতায় তিনি বুঝিয়ে দেন—আল্লাহর সৃষ্টি মানুষের কল্পনার চেয়েও অসীম।

এই অলৌকিক সফরের বাহন ছিল জান্নাতি ‘বুরাক’। সময় ও দূরত্বের সমস্ত প্রচলিত ধারণাকে অতিক্রম করে মুহূর্তেই মক্কা থেকে বাইতুল মোকাদ্দাসে পৌঁছে যাওয়া—এ ঘটনা আধুনিক বিজ্ঞানের যুগেও মানুষকে বিস্মিত করে। অথচ আল্লাহর জন্য এটি কোনো অসম্ভব কিছু নয়।

বাইতুল মোকাদ্দাসে নবীজি (সা.) যখন সব নবী-রাসূলকে নিয়ে নামাজ আদায় করেন, তখন একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়—ইসলাম কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্ম নয়, বরং সব নবীর শিক্ষা ও তাওহিদের চূড়ান্ত রূপ। এখানে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ইমামতি প্রমাণ করে—নবুয়তের সিলসিলার পূর্ণতা তাঁর মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে।

সাত আসমানে একে একে নবীদের সাথে সাক্ষাৎ ছিল শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং প্রত্যেক নবীর জীবনসংগ্রাম, ধৈর্য ও ত্যাগের ধারাবাহিকতা নবীজি (সা.)-এর সামনে তুলে ধরা। আদম (আ.) থেকে ইব্রাহিম (আ.)—প্রত্যেকেই যেন সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন, সত্যের পথে চলা কখনো সহজ নয়, কিন্তু পরিণতি সর্বদা সম্মানজনক।

বায়তুল মামুরে প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতার ইবাদত মানুষের ইবাদতের তুলনাকে নগণ্য করে দেয়। এখানেই মানুষ উপলব্ধি করতে পারে—আল্লাহর দরবারে ফেরেশতা ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও, ইবাদতে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই।

‘সিদরাতুল মুনতাহা’—এই নামটি নিজেই এক গভীর তাৎপর্য বহন করে। এটি সেই সীমা, যেখানে সৃষ্টির জ্ঞান থেমে যায়। নবীজি (সা.)-এর এই পর্যায়ে পৌঁছানো প্রমাণ করে—আল্লাহ তাঁকে এমন মর্যাদা দিয়েছেন, যা আর কোনো সৃষ্টিকে দেননি।

জান্নাতের সৌন্দর্য আর কাউসার নদীর বর্ণনা মানুষের মনে আশার আলো জ্বালায়। কিন্তু একই সঙ্গে মেরাজের সফরে দেখানো শাস্তিগুলো ভয় ধরিয়ে দেয়। গীবতকারী, ভণ্ড বক্তা, সুদখোরদের ভয়াবহ পরিণতি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়—ইসলাম শুধু বিশ্বাসের নাম নয়, বরং চরিত্র ও আচরণের ধর্ম।

জাহান্নামের প্রহরী মালিক (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—শাস্তি কোনো কল্পনা নয়, এটি বাস্তব। আর সেই বাস্তবতা থেকে বাঁচার একমাত্র পথ আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা।

মেরাজের সবচেয়ে বড় উপহার—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। এটি কোনো সাধারণ বিধান নয়; এটি এমন এক ইবাদত, যা সরাসরি আসমান থেকে দেওয়া হয়েছে। নামাজ মুমিনের মেরাজ—এই কথার গভীরতা এখানেই।

আজকের অস্থির, স্বার্থপর ও মূল্যবোধহীন সমাজে মেরাজ আমাদের ডাক দেয় আত্মসমালোচনার দিকে। আমরা কি নামাজকে বোঝা মনে করছি? আমরা কি মুখে ভালো বলছি, কাজে তার বিপরীত করছি? যদি তাই হয়, তবে মেরাজ আমাদের জন্য শুধু গল্পই থেকে যাবে—শিক্ষা নয়।

মেরাজ আমাদের শেখায়—আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে হলে হৃদয়কে পরিষ্কার করতে হবে, আমলকে ঠিক করতে হবে, আর দুনিয়ার মোহের শিকল ভাঙতে হবে।

তথ্যসূত্র:
সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিজী ও নির্ভরযোগ্য সীরাত গ্রন্থ।