কিছু মানুষ জীবনে আসেন খুব অল্প সময়ের জন্য, অথচ তাঁদের চলে যাওয়ার পর মনে হয়—পরিচয়টি যেন ছিল বহুদিনের, সম্পর্কটি যেন ছিল বহু জন্মের। কিছু মানুষ সময়ের ক্যালেন্ডারে কয়েকটি মাস মাত্র, কিন্তু স্মৃতির পাতায় তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি পূর্ণ অধ্যায়। আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা এটিএম আশরাফ উদ্দীন রহ. আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ।
তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগের সূচনা ২০২৩ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে। সময়ের হিসাবে খুব বেশি দিন নয়; কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্বের যে ছাপ হৃদয়ে পড়েছিল, তা সময়ের হিসাব মানে না। অল্প কথায়, অল্প পরিচয়ে, অল্প সময়ের সান্নিধ্যে একজন মানুষ কতটা আপন হয়ে উঠতে পারেন—আশরাফ হুজুর রহ. ছিলেন তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মাদ্রাসা ছিল তাঁর চিন্তার আকাশ:
আশরাফ হুজুর রহ.-এর সঙ্গে কথা বললেই যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অনুভব করতাম, তা হলো—মাদ্রাসা নিয়ে তাঁর গভীর যিকির-ফিকির।
আল-ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা তাঁর কাছে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল তাঁর স্বপ্ন, সাধনা, দায়িত্ব ও ভালোবাসার ঠিকানা। মনে হতো, মাদ্রাসার প্রতিটি ইটের সঙ্গে তাঁর হৃদয়ের একটি করে সম্পর্ক রয়েছে; প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে তাঁর স্বপ্নের একটি করে আলো জ্বলছে।
মাদ্রাসার কোনো বিষয় উঠলেই তাঁর কথায় আলাদা এক ব্যস্ততা ফুটে উঠত। কোথায় কী উন্নতি করা যায়, কীভাবে শিক্ষার মান বাড়ানো যায়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কীভাবে আরও সুন্দর পরিবেশ দেওয়া যায়—এসব ভাবনা যেন তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল।
তিনি শুধু মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ছিলেন না; ছিলেন প্রতিষ্ঠানের একজন অভিভাবক, খাদেম ও স্বপ্নদ্রষ্টা।
দায়িত্ব তাঁর কাছে ছিল আমানত:
দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন সচেতন, সুশৃঙ্খল ও যত্নবান। তাঁর আচরণে মনে হতো, পদ তাঁর কাছে মর্যাদার বিষয়ের চেয়ে বেশি ছিল আমানতের বিষয়।
তিনি জানতেন—একটি দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক কাগজপত্র, ক্লাসের রুটিন কিংবা পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ, একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তি এবং দ্বীনের খেদমতের একটি দীর্ঘ প্রত্যাশা।
তাই মাদ্রাসার ব্যাপারে তাঁর সতর্কতা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে গভীর। তাঁর চিন্তায় ছিল প্রতিষ্ঠান, কথায় ছিল প্রতিষ্ঠান, কর্মব্যস্ততায় ছিল প্রতিষ্ঠান—মনে হতো, মাদ্রাসাই যেন তাঁর চিন্তার এক বিশাল আকাশ।
কঠোর দায়িত্ব, কোমল হৃদয়:
আশরাফ হুজুর রহ.-এর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে মুগ্ধকর দিকগুলোর একটি ছিল—দায়িত্ব পালনে সচেতন, অথচ আচরণে কোমল।
অধীনস্থ শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে তিনি কথা বলতেন অত্যন্ত সতর্কতা ও ভদ্রতার সঙ্গে। নেতৃত্বের আসনে থেকেও তাঁর মধ্যে কর্তৃত্বের অহংকার দেখিনি; বরং দেখেছি বিনয়ের সৌন্দর্য।
তিনি ছিলেন নরম দিলের মানুষ। তাঁর কথায় অযথা কঠোরতা ছিল না, আচরণে রুক্ষতা ছিল না। বরং তাঁর হাস্যোজ্জ্বল মুখ, শান্ত স্বভাব এবং নম্র ব্যবহার মানুষকে স্বস্তি দিত।
সম্ভবত এ কারণেই তাঁর বিদায়ের পর বিভিন্ন মানুষের মুখে একই কথা শুনেছি—
“আশরাফ হুজুর খুবই বিনয়ী মানুষ ছিলেন, নরম দিলের মানুষ ছিলেন।”
একজন মানুষের মৃত্যুর পর যখন তাঁর পদ-পদবি নয়, সম্পদ নয়, ক্ষমতা নয়—বরং বিনয় ও কোমলতার কথা মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসে, তখন বুঝতে হয়, তিনি মানুষের হৃদয়ে কোনো গভীর দাগ রেখে গেছেন।
বান্দার হকের ব্যাপারে ছিলেন সতর্ক:
আশরাফ হুজুর রহ.-এর আরেকটি গুণ আমাকে বিশেষভাবে স্পর্শ করেছিল—বান্দার হকের ব্যাপারে তাঁর সচেতনতা।
মানুষের অধিকার, প্রাপ্য ও পাওনাকে তিনি হালকাভাবে দেখতেন না। তিনি বুঝতেন, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণও একজন মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।
তাঁর এই মানবিকতা ছিল নীরব, কিন্তু গভীর। প্রচারের আলোয় নয়, দৈনন্দিন আচরণের ছোট ছোট মুহূর্তে তার প্রকাশ ঘটত।
অর্থ ছিল, কিন্তু হৃদয় ছিল মাদ্রাসার জন্য:
আশরাফ হুজুর রহ.-এর জীবন স্মরণ করলে তাঁর মাদ্রাসাপ্রীতির কথা আলাদাভাবে বলতে হয়।
আল্লাহ তাঁকে আর্থিক সামর্থ্য দিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থ তাঁকে মাদ্রাসা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি; বরং মাদ্রাসার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাকে আরও গভীর করেছে।
নিজের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রতিষ্ঠানের জন্য ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। তাঁর অর্থ, শ্রম, সময়, চিন্তা—সবকিছুর মধ্যে মাদ্রাসার জন্য একটি বিশেষ অংশ যেন নির্ধারিত ছিল।
মনে হতো—
সম্পদ ছিল তাঁর হাতে,
কিন্তু হৃদয় ছিল মাদ্রাসার কাছে।
এই আত্মনিবেদনই তাঁকে আমার কাছে আলাদা করে তুলেছে।
সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখটি আজও মনে পড়ে
আজ যখন আশরাফ হুজুর রহ.-এর কথা মনে পড়ে, সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল চেহারা।
কত মানুষ আসে, কত মানুষ চলে যায়। কারও মুখ মনে থাকে না, কারও কথা মনে থাকে না। কিন্তু কিছু মুখ সময়ের ধুলোয় মুছে যায় না। আশরাফ হুজুর রহ.-এর হাসিমুখ তেমনই একটি মুখ।
তাঁর মুখে ছিল প্রশান্তির ছায়া, কথায় ছিল কোমলতার সুর, আচরণে ছিল বিনয়ের সুবাস।
তাঁর চলে যাওয়ার পর মনে হয়েছে—
মানুষটি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর ব্যবহার যেন রয়ে গেছে;
কণ্ঠস্বর থেমে গেছে, কিন্তু তাঁর কথা যেন এখনো কানে বাজে;
হাসিমুখটি আড়াল হয়েছে, কিন্তু সেই হাসির স্মৃতি এখনো হৃদয়ে জেগে আছে।
তাঁর বিদায়—একটি নীরব সাক্ষ্য:
একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য অনেক সময় তাঁর জীবদ্দশায় নয়, তাঁর বিদায়ের পর মানুষের স্মৃতিচারণে প্রকাশ পায়।
আশরাফ হুজুর রহ.-এর বিদায়ের পর মানুষের মুখে মুখে যে কথাগুলো শুনেছি, সেগুলো আমার নিজের দেখা ও অনুভবের সঙ্গেও মিলে যায়—তিনি ছিলেন বিনয়ী, নরম দিলের, মানুষের হক সম্পর্কে সচেতন এবং মাদ্রাসার প্রতি গভীরভাবে নিবেদিত একজন মানুষ।
এ যেন তাঁর জীবনের জন্য মানুষের পক্ষ থেকে এক নীরব সাক্ষ্য।
আল-ফালাহ দাখিল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল হিসেবে তাঁর নাম প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে লেখা থাকবে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা—তাঁর সঙ্গে যারা কথা বলেছেন, তাঁর পাশে যারা কাজ করেছেন, তাঁর কাছ থেকে যারা ভালোবাসা পেয়েছেন, তাঁদের হৃদয়ের ইতিহাসেও তিনি বেঁচে থাকবেন।
মানুষ চলে যায়, আদর্শ থেকে যায়:
দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। পদ থাকে না, প্রাসাদ থাকে না, সম্পদও একদিন অন্যের হাতে চলে যায়। কিন্তু মানুষের ইখলাস, খেদমত, চরিত্র ও ভালোবাসা—এসবের স্মৃতি অনেক দীর্ঘজীবী।
আশরাফ হুজুর রহ.-এর জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল পরিচয় আমার কাছে তাঁর পদ নয়; তাঁর বিনয়।
সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর অর্থ নয়; তাঁর মাদ্রাসার প্রতি আত্মনিবেদন।
সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি তাঁর কোনো বিশেষ কথাও নয়; বরং তাঁর হাস্যোজ্জ্বল মুখ ও কোমল আচরণ।
আর তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো আল-ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা—যে প্রতিষ্ঠানকে তিনি ভালোবেসেছেন, লালন করেছেন এবং নিজের সামর্থ্য দিয়ে গড়ে তুলেছেন।
আশা করি, আল্লাহ তাআলা তাঁর এই খেদমতগুলো কবুল করবেন। দুনিয়ায় তিনি যে ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছেন, আখিরাতেও আল্লাহ তাঁকে সম্মানের চাদরে আবৃত করুন। আমরা তাঁর ব্যাপারে ভালো ধারণা পোষণ করি এবং আল্লাহর রহমতের আশাবাদী।
হে আল্লাহ! তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন। তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন। তাঁর খেদমতগুলো কবুল করুন। তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন। তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে স্থান দিন। তাঁর রেখে যাওয়া দ্বীনি প্রতিষ্ঠানকে কবুল করুন এবং তা তাঁর জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন।
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ، وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الْأَبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِنْ دَارِهِ، وَأَهْلًا خَيْرًا مِنْ أَهْلِهِ، وَزَوْجًا خَيْرًا مِنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ، وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ۔
আল্লাহুম্মা আমিন।
সহ সুপার, আল ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা
পশ্চিম দৌলতপুর, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী
01301418823, 01867611814
nazmulislam19122@gmail.com
























