০২:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংয়ে ভাঙা ব্যারিয়ার, ঝুঁকিতে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথ গেটম্যান নেই, নিরাপত্তা ব্যবস্থা অকার্যকর—আরেকটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার আশঙ্কা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:০৮:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
  • ১০০০১ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শাহজাহান বাশার

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাকশিমুল ইউনিয়নের কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিং যেন এখন এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ। দীর্ঘদিন ধরে রেলক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকলেও তা মেরামত কিংবা কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের ওপর অবস্থিত এই ক্রসিংয়ে গেটম্যান না থাকায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পারাপার করছেন হাজারো মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ। একই সঙ্গে বুড়িচং উপজেলা সদরে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান সড়ক হওয়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, ট্রাক, ট্রলি, সিএনজি, অটোরিকশা, ভ্যান ও রিকশা এ পথ ব্যবহার করে। ব্যারিয়ার ও গেটম্যান না থাকায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। রেলক্রসিংটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। একদিকে ব্যস্ত রেলপথে নিয়মিত দ্রুতগতির ট্রেন চলাচল করছে, অন্যদিকে একই ক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন চলাচল করছে। ফলে সামান্য অসতর্কতা কিংবা মুহূর্তের ভুলেই ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের প্রাণহানি।

স্থানীয় বাসিন্দা, সাংবাদিক ও লেখক শাহাজাহান বাশার, মোরশেদ আলম, মেডিসিন ব্যবসায়ী লোকমান ও জামাল জানান, প্রায় দুই বছর আগে এই রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় একটি অটোরিকশাকে চলন্ত ট্রেন ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের পর অটোরিকশাটি প্রায় ৫০ হাত দূরে ছিটকে পড়ে। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হন বলে তারা জানান। স্থানীয়দের প্রশ্ন—একটি দুর্ঘটনায় ছয়টি প্রাণ ঝরে যাওয়ার পরও যদি একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান ও কার্যকর ব্যারিয়ার নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে আর কত প্রাণ গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে? তাদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর কিছুদিন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও উপেক্ষিত হয়েছে। বর্তমানে ব্যারিয়ার ভাঙা এবং গেটম্যান না থাকায় ট্রেন আসার সময় চালক ও পথচারীদের নিজেদের সতর্কতার ওপর নির্ভর করেই রেললাইন পার হতে হচ্ছে।

কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংটি শুধু স্থানীয় কয়েকটি গ্রামের মানুষের চলাচলের পথ নয়; এটি বুড়িচং উপজেলা সদরের সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কপথ। প্রতিদিন এ পথ দিয়ে ট্রাক, ট্রলি, সিএনজি অটোরিকশা, ভ্যান, রিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রোগী ও সাধারণ পথচারীরাও নিয়মিত এই ক্রসিং ব্যবহার করেন। দিনের ব্যস্ত সময়ে রেলক্রসিং এলাকায় মানুষের চাপ আরও বেড়ে যায়। কোনো গেটম্যান না থাকায় ট্রেন আসার আগ মুহূর্তে কে রেললাইন পার হচ্ছে আর কে অপেক্ষা করছে—তা নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। বিশেষ করে কুয়াশা, রাতের অন্ধকার কিংবা বৃষ্টির সময় ঝুঁকি আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায় বলে স্থানীয়রা জানান।

রেলক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার ট্রেন আসার সময় সড়কপথের যানবাহন ও পথচারীদের রেললাইনে প্রবেশ বন্ধ করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কিন্তু কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংয়ে সেই ব্যারিয়ার দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর থাকায় ট্রেন চলাচলের সময়ও সড়কপথের যানবাহন নির্বিঘ্নে রেললাইনের কাছে চলে আসছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একজন দায়িত্বশীল গেটম্যান এবং একটি সচল ব্যারিয়ার থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে দুটিরই ঘাটতি থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংবাদিক-লেখক শাহাজাহান বাশার, মোরশেদ আলম, মেডিসিন ব্যবসায়ী লোকমান ও জামাল বলেন, কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংয়ের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করে। ট্রেন কখন আসছে, তা বুঝে পারাপার করতে হয়। একটি সচল ব্যারিয়ার ও গেটম্যান থাকলে মানুষ অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করত। তারা আরও বলেন, অতীতে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে দুর্ঘটনার আগেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কালিকাপুর আব্দুল মতিন ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক সঞ্জয় চন্দ্র দাস বলেন, “এই রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান ও ব্যারিয়ার দুটিই জরুরি। নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এটি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। দ্রুত সংস্কার করে জনগণের দাবি বাস্তবায়ন করা উচিত।” তার মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে এ পথের ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা অনেক। তাই বিষয়টি শুধু একটি রেলগেট সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জননিরাপত্তার বিষয় জড়িত।

এ বিষয়ে বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর হোসেন বলেন, “বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগও কি বিষয়টি নজরে নেবে? কারণ রেলক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার, গেটম্যান ও রেলওয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ ছাড়া সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা অবকাঠামো নষ্ট হয়ে দীর্ঘদিন পড়ে থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একটি লেভেল ক্রসিংয়ে ব্যারিয়ার অকার্যকর থাকলে শুধু যানবাহন চালকদের সতর্ক থাকার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। সেখানে কার্যকর সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় সাইনবোর্ড, দৃশ্যমান সংকেত এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী থাকা জরুরি। বিশেষ করে ব্যস্ত রেলপথে ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিংগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের দাবি, আরেকটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংয়ের ভাঙা ব্যারিয়ার পুনঃস্থাপন ও সচল করতে হবে, স্থায়ীভাবে গেটম্যান নিয়োগ করতে হবে, রেলক্রসিংয়ের সতর্কীকরণ সাইন ও সংকেত ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে, রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অতীতে সংঘটিত দুর্ঘটনার কারণ ও বর্তমান নিরাপত্তা ঘাটতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় আরও একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তখন হয়তো আবারও প্রাণহানির পর প্রশাসন ও রেলওয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত এবং ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ দেখা যাবে। কিন্তু তার আগেই যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে একটি সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এবং মূল্যবান প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব।

প্রশ্ন উঠেছে—আর কত প্রাণহানি হলে কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংকে নিরাপদ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্থায়ী উদ্যোগ দেখা যাবে? স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মানুষের জীবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যারিয়ার পুনঃস্থাপন, গেটম্যান নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ সম্পন্ন করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সতর্কতাঃ এই ওয়েবসাইটে নিজস্ব সংবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম থেকে সূত্র উল্লেখপূর্বক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত কোনো সংবাদের বিষয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে অনুগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট মূল সংবাদমাধ্যমের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও ও অন্যান্য কনটেন্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, অনুলিপি, পুনঃপ্রকাশ বা প্রচার করা কপিরাইট আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংয়ে ভাঙা ব্যারিয়ার, ঝুঁকিতে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথ গেটম্যান নেই, নিরাপত্তা ব্যবস্থা অকার্যকর—আরেকটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার আশঙ্কা

কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংয়ে ভাঙা ব্যারিয়ার, ঝুঁকিতে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথ গেটম্যান নেই, নিরাপত্তা ব্যবস্থা অকার্যকর—আরেকটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার আশঙ্কা

Update Time : ০২:০৮:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

মোঃ শাহজাহান বাশার

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাকশিমুল ইউনিয়নের কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিং যেন এখন এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ। দীর্ঘদিন ধরে রেলক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকলেও তা মেরামত কিংবা কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের ওপর অবস্থিত এই ক্রসিংয়ে গেটম্যান না থাকায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পারাপার করছেন হাজারো মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ। একই সঙ্গে বুড়িচং উপজেলা সদরে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান সড়ক হওয়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, ট্রাক, ট্রলি, সিএনজি, অটোরিকশা, ভ্যান ও রিকশা এ পথ ব্যবহার করে। ব্যারিয়ার ও গেটম্যান না থাকায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। রেলক্রসিংটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। একদিকে ব্যস্ত রেলপথে নিয়মিত দ্রুতগতির ট্রেন চলাচল করছে, অন্যদিকে একই ক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন চলাচল করছে। ফলে সামান্য অসতর্কতা কিংবা মুহূর্তের ভুলেই ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের প্রাণহানি।

স্থানীয় বাসিন্দা, সাংবাদিক ও লেখক শাহাজাহান বাশার, মোরশেদ আলম, মেডিসিন ব্যবসায়ী লোকমান ও জামাল জানান, প্রায় দুই বছর আগে এই রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় একটি অটোরিকশাকে চলন্ত ট্রেন ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের পর অটোরিকশাটি প্রায় ৫০ হাত দূরে ছিটকে পড়ে। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হন বলে তারা জানান। স্থানীয়দের প্রশ্ন—একটি দুর্ঘটনায় ছয়টি প্রাণ ঝরে যাওয়ার পরও যদি একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান ও কার্যকর ব্যারিয়ার নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে আর কত প্রাণ গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে? তাদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর কিছুদিন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও উপেক্ষিত হয়েছে। বর্তমানে ব্যারিয়ার ভাঙা এবং গেটম্যান না থাকায় ট্রেন আসার সময় চালক ও পথচারীদের নিজেদের সতর্কতার ওপর নির্ভর করেই রেললাইন পার হতে হচ্ছে।

কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংটি শুধু স্থানীয় কয়েকটি গ্রামের মানুষের চলাচলের পথ নয়; এটি বুড়িচং উপজেলা সদরের সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কপথ। প্রতিদিন এ পথ দিয়ে ট্রাক, ট্রলি, সিএনজি অটোরিকশা, ভ্যান, রিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রোগী ও সাধারণ পথচারীরাও নিয়মিত এই ক্রসিং ব্যবহার করেন। দিনের ব্যস্ত সময়ে রেলক্রসিং এলাকায় মানুষের চাপ আরও বেড়ে যায়। কোনো গেটম্যান না থাকায় ট্রেন আসার আগ মুহূর্তে কে রেললাইন পার হচ্ছে আর কে অপেক্ষা করছে—তা নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। বিশেষ করে কুয়াশা, রাতের অন্ধকার কিংবা বৃষ্টির সময় ঝুঁকি আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায় বলে স্থানীয়রা জানান।

রেলক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার ট্রেন আসার সময় সড়কপথের যানবাহন ও পথচারীদের রেললাইনে প্রবেশ বন্ধ করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কিন্তু কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংয়ে সেই ব্যারিয়ার দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর থাকায় ট্রেন চলাচলের সময়ও সড়কপথের যানবাহন নির্বিঘ্নে রেললাইনের কাছে চলে আসছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একজন দায়িত্বশীল গেটম্যান এবং একটি সচল ব্যারিয়ার থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে দুটিরই ঘাটতি থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংবাদিক-লেখক শাহাজাহান বাশার, মোরশেদ আলম, মেডিসিন ব্যবসায়ী লোকমান ও জামাল বলেন, কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংয়ের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করে। ট্রেন কখন আসছে, তা বুঝে পারাপার করতে হয়। একটি সচল ব্যারিয়ার ও গেটম্যান থাকলে মানুষ অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করত। তারা আরও বলেন, অতীতে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে দুর্ঘটনার আগেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কালিকাপুর আব্দুল মতিন ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক সঞ্জয় চন্দ্র দাস বলেন, “এই রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান ও ব্যারিয়ার দুটিই জরুরি। নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এটি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। দ্রুত সংস্কার করে জনগণের দাবি বাস্তবায়ন করা উচিত।” তার মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে এ পথের ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা অনেক। তাই বিষয়টি শুধু একটি রেলগেট সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জননিরাপত্তার বিষয় জড়িত।

এ বিষয়ে বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর হোসেন বলেন, “বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগও কি বিষয়টি নজরে নেবে? কারণ রেলক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার, গেটম্যান ও রেলওয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ ছাড়া সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা অবকাঠামো নষ্ট হয়ে দীর্ঘদিন পড়ে থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একটি লেভেল ক্রসিংয়ে ব্যারিয়ার অকার্যকর থাকলে শুধু যানবাহন চালকদের সতর্ক থাকার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। সেখানে কার্যকর সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় সাইনবোর্ড, দৃশ্যমান সংকেত এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী থাকা জরুরি। বিশেষ করে ব্যস্ত রেলপথে ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিংগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের দাবি, আরেকটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংয়ের ভাঙা ব্যারিয়ার পুনঃস্থাপন ও সচল করতে হবে, স্থায়ীভাবে গেটম্যান নিয়োগ করতে হবে, রেলক্রসিংয়ের সতর্কীকরণ সাইন ও সংকেত ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে, রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অতীতে সংঘটিত দুর্ঘটনার কারণ ও বর্তমান নিরাপত্তা ঘাটতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় আরও একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তখন হয়তো আবারও প্রাণহানির পর প্রশাসন ও রেলওয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত এবং ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ দেখা যাবে। কিন্তু তার আগেই যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে একটি সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এবং মূল্যবান প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব।

প্রশ্ন উঠেছে—আর কত প্রাণহানি হলে কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংকে নিরাপদ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্থায়ী উদ্যোগ দেখা যাবে? স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মানুষের জীবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যারিয়ার পুনঃস্থাপন, গেটম্যান নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ সম্পন্ন করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।