১১:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পঠন-পাঠন ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বিশিষ্টজনেরা বলেন, একজন আদর্শ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকই পারেন একটি আদর্শ বিদ্যালয় গড়ে তুলতে।

শিক্ষকের চেয়ার বসে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব কাম্য নয়; একজন আদর্শ শিক্ষক পারেন আদর্শ স্কুল গড়তে

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৮:২১:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
  • ১০০২৪ বার পঠিত হয়েছে

শিক্ষকের আসনে বসে দলীয় রাজনীতি না করে আদর্শ বিদ্যালয় গঠনে মনযোগী হওয়ার বার্তা। ছবি: দৈনিক সরেজমিন।

মোঃ হাসানুর জামান বাবুঃ শিক্ষা, শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শব্দগুলোর সম্পর্ক নিবিড়। একটি ছাড়া আরেকটি অচল। শিক্ষকের অর্বতমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলে না। আবার উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশহীন স্কুলে ভালো শিক্ষক তার মেধা ও মননের বিকাশ ঘটাতে পারে না।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছে পরিবর্তন, লেগেছে যুগের হাওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই আধুনিক শিক্ষা আর পরিবর্তনটা কি শুধু অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর ব্যবসায়িক মনোভাবকেই বাড়িয়েছে? বাড়ায়নি কি মানসম্মত আর আদর্শ শিক্ষার হার? উত্তরটা হবে বেড়েছে দুটোই। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে সুনাম অর্জন করে, তেমনি শিক্ষকতার মহান পেশায় যারা জড়িত থাকেন তাদের আমাদের সমাজের সব পর্যায়ের লোক সম্মান করেন। আমাদের এ সমাজ, সেসব মহান পেশার ব্যক্তিকে শিক্ষক হিসাবে, ওস্তাদ নামে সম্বোধন করেন থাকে।আবার উনারা যখন শিক্ষকতার এই মহান পেশার একটি চেয়ার বসে একটি নিদিষ্ট রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পরিচালনা করেন,ক্লাসে বিষয় ভিত্তিক শ্রেণী কার্যক্রমের বাহিরে নিজ দলের নীতি আদর্শ গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করেন,তখন ঐ শিক্ষকের প্রতি আস্তে আস্তে এলাকার মানুষের সার্বজনীন সম্মান শ্রদ্ধা ভালোবাসা ওস্তাদ বলে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সম্মান উল্টো ঘৃণা ধিক্কার সমালোচনায় পরিনত হয়ে উঠে। কারণ রাজনীতি নিজের ব্যক্তিগত বিষয় এবং গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতি করা নাগরিক অধিকার।
কিন্তু প্রশ্ন হলো আমাদের সন্তানদের আমরা বুকভরা ভরসা নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাই ওস্তাদের হাতে বহুমুখী প্রতিভাবান হয়ে একজন দেশের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এবং স্কুলের শিক্ষকের ও অভিভাবকে এর মুখ উজ্জ্বল করতে; আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কাজ থেকে রাজনৈতিক দলের দীক্ষা নেওয়ার জন্য এতো টাকা পয়সা খরচ করে বেতন ভাতা ফি দিয়ে স্কুলে ভর্তি করাই না।এখন ভর্তির পর যখন দেখি আমাদের সকলের সম্মানে পাত্র ওস্তাদ যখন পাঠ্যবইয়ের মৌলিক বিষয় বাদ উনার নিজের রাজনীতির দলের নীতি আদর্শ গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করেন, তখন স্বাভাবিক ভাবেই শিক্ষকের প্রতি ঘৃণা অশ্রদ্ধা অশ্লীল বাক্য ছুঁড়ে দিতে আমরা অভিভাবকরা এক মিনিট চিন্তা করিনা। কারণ জাতির মেরুদণ্ড একজন শিক্ষক যখন নিজের নীতি আদর্শ সম্মান শ্রদ্ধা ভালোবাসা ওস্তাদ হিসেবে নীতি নৈতিকতা বুঝতে সক্ষম নয়,এবং নিজের পেশার মর্যাদা নিজেই বুঝতে পারেন না। তাহলে আমরা উনাকে আর এতো সম্মান শ্রদ্ধা ভালোবাসা দিয়ে ওস্তাদ বানিয়ে মাথায় তুলে রেখে কি লাভ⁉️
কথা গুলো এইজন্যই বলতে বাধ্য হলাম এই জন্য যে আমাদের চট্টগ্রাম পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কিছু সম্মানিত শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধান শ্রেনী কক্ষে ক্লাস টাইমে ছাত্রদের একটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের দীক্ষা দিচ্ছেন! সম্প্রতি এমন কিছু ছবি ভিডিও দেখে আমি রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম!! যেখানে সরকারি বেতনভুক্ত জনগণের টেক্স এর টাকায় বেতন ভাতা নেওয়া কোন কর্মকর্তা শিক্ষক শিক্ষিকা কর্মচারী কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে অংশ গ্রহণ প্রচার প্রচরণা চালানো সুস্পষ্ট চাকুরীবিধি লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ঠিক সেই সময় সেই পরিস্থিতিতে কিভাবে আমাদের এলাকায় খোদ ক্লাস রুমে ক্লাস চলাকালীন সময়ে সরাসরি রাজনৈতিক দলের দীক্ষা দেওয়া ও কার্যক্রম পরিচালনা করার মতো সাহস কিভাবে করেন উনারা ⁉️ উনারা কি তাহলে বর্তমান সরকারের সকল নিয়ম নীতি আদর্শের বাহিরে? উনারা কি তাহলে সরকারকে এবং সরকারি বেসরকারি চাকুরী বিধি মানের না⁉️যদি সত্যি তাই হয়ে থাকে তাহলে আসলেই উনাদের খুঁটির জোর কোথায়? আজকে আর বেশি লিখবো না যেহেতু অনেক ডকুমেন্টস ইতিমধ্যে আমার হাতে এসেছে পরবর্তীতে একদিন বিস্তারিত তথ্য প্রমাণ সহ লিখবো।
তবে দুঃখ জনক হলেও সত্য এইসব শিক্ষকদের মধ্যে থেকে একজন প্রধান শিক্ষক ও একজন সিনিয়র শিক্ষককে চট্টগ্রাম-১২ পটিয়া নির্বাচনী এলাকার মাননীয় সংসদ সদস্য জননেতা আলহাজ্ব এনামুল হক এনাম সাহেব ইতিমধ্যে পরোক্ষভাবে দুইবার সতর্ক করেছেন এবং পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয় ও পরিচালনা কমিটির সভাপতির মাধ্যমে উনাদের সতর্ক করেছেন। কিছু উনাদের হাত এতোটাই লম্বা যে, কথাবার্তায় মনে হয় উনারা প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও শক্তিশালী।যাই হোক আজকে এই দিকে আর যাবোনা।

আমাদের ব্যাক্তি-রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শিক্ষার গুরুত্ব অনেক। ধর্মীয়ভাবেও রয়েছে শিক্ষার অপরিসীম গুরুত্ব । সেই গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিতে প্রয়োজন ভালো এবং মেধাসম্পন্ন শিক্ষক। আর আদর্শ শিক্ষকের ক্ষেত্র তৈরিতে দরকার ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এখানে শিক্ষা ও শিক্ষক শব্দ দুটি একটি অপরটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। মূল কথা হচ্ছে, শিক্ষাই আলো, শিক্ষাই জাতির মেরুদ-, শিক্ষা ছাড়া সব মত-পথ অন্ধকার। একটি কথা উল্লেখযোগ্য যে, প্রকৃত এবং আদর্শ শিক্ষাগ্রহণ করতে হলে আদর্শবান, ভালো শিক্ষক ছাড়া তা অসম্ভব।

শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। শিক্ষকতার উদ্দেশ্য জ্ঞানের বিকাশ ঘটানো, মনুষ্যত্বকে ফুটিয়ে তোলা, একজন শিক্ষার্থীকে সঠিক পাঠদানের মাধ্যমে তাকে আদর্শবান করে গড়ে তোলা। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্য বইয়ের নয়, এর বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ে যেমনÑনৈতিক শিক্ষা, চেতনা, দেশপ্রেম, মা-বাবা ও পরিবার ও সামাজিকতা শিক্ষাসহ অনেক বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। একজন শিক্ষক হচ্ছেন জাতি গঠন করার কারিগর। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর জন্য হবেন মডেল। শিক্ষকতা পেশাকে কেবলমাত্র চাকরি বা অর্থ উপাজর্নের মাধ্যম নয়, মহান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করবেন এবং তা আন্তরিকতার সঙ্গে অনেকটা নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দেবেন তার মেধা-মননে। শিক্ষাদানের কৌশল হিসেবে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবেন, যাতে তার মেধার সব পর্যায় বিকাশ হয়। একজন সঠিক লক্ষ্যধারী স্বপ্নবাজ শিক্ষক নিজে স্বপ্ন দেখবেন সঙ্গে তার শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখাবেন। সত্যি বলতে একজন আদর্শ ও ভালো শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীর সার্বক্ষণিক অভিভাবক। তিনি আদেশ, উপদেশ, শাসন আর বন্ধুত্ব সুলভ আচরণে চমৎকার সম্পর্ককে শানিত করবেন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। আর এভাবেই শিক্ষার্থীর মঙ্গলের সঙ্গেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে আদর্শ, শিক্ষক হবেন উত্তম আদর্শবান। একজন অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকের এটাই চাওয়া।

‘কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের সহজ-সরল ভাষায় সুন্দর বাচনভঙ্গি ও উপস্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া উচিত। ভালো শিক্ষকের নির্দিষ্ট কয়েকটি গুণ রয়েছে, যেমনÑ১. শিক্ষাদানে সবসময় প্রস্তুত থাকেন, ২. সবসময় পড়াশোনার মধ্যে থাকেন, ৩. সব ধরনের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে চলেন, ৪. ছাত্রছাত্রীদের সত্য ও আদর্শের পথে চালিত করেন, ৫. ছাত্রছাত্রীদের ভালো কাজে উৎসাহ দিয়ে থাকেন, ৬. ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আন্তরিক বন্ধন তৈরি করেন, ৭. আনন্দের সঙ্গে পড়ান।’ (সংগৃহীত)

যখন একজন শিক্ষক এসব আদর্শকে অর্থের কাছে বিকিয়ে দিয়ে শিক্ষাকে বাণিজ্যিক চিন্তার ভেতর ঢুকিয়ে দেন তখন শিক্ষা আর আদর্শকে ধরে রাখতে পারে না। শিক্ষক হয়ে পড়েন লোভী, শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তখন সে নামধারী ভালো-আদর্শ থেকে মেধা-মননের বিকাশ আশা করা বোকামি। তারপরও আমাদের সমাজে সেই শিক্ষা ব্যবস্থাতেই আমাদের অভিভাবক অন্ধমোহে ছুটছেন সন্তানকে নিয়ে নোংরা প্রতিযোগিতায়, যেখানে ভবিষ্যৎ আলোর বদলে আঁধারকেই উসকে দিচ্ছে কতিপয় স্বার্থান্বেষীর অসৎ উদ্দেশ্যে। যা কখনো কাম্য নয়। আমরা নিজেদের অবস্থান থেকে শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে এই শিক্ষা বাণিজ্য থেকে বেরিয়ে আসি এবং সবাই মেধার মূল্যায়ন, আদর্শ ও নৈতিকতার চর্চা অব্যাহত রাখি।

একজন আদর্শ শিক্ষক তিনিই, শিক্ষাকে যিনি পূর্ণতা দেন, যিনি ভালো শিক্ষা দেন। সে কারণে যিনি শিক্ষকতার মতো মহৎ পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেন তিনি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। শিক্ষাদান একটি মহৎ শিল্প। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকই এই শিল্পের মাধ্যম ও কারিগর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় গুণসম্পন্ন একজন শিক্ষক দেশ ও সমাজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তেমনি সব বিষয়ে শিক্ষাবান্ধব স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদ। আর এসব সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে শিক্ষকদের চাহিদা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে উন্নত ও মানসম্মত করতে সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়ন জরুরি। পরিশেষে বলা যায়, একজন আদর্শ-ভালো শিক্ষক কেবল শিক্ষার্থীকেই নয় একটি স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।

লেখক:- মিডিয়া কর্মী ক্রীড়া সংগঠক ও সাবেক একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্য।

সতর্কতাঃ এই ওয়েবসাইটে নিজস্ব সংবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম থেকে সূত্র উল্লেখপূর্বক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত কোনো সংবাদের বিষয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে অনুগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট মূল সংবাদমাধ্যমের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও ও অন্যান্য কনটেন্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, অনুলিপি, পুনঃপ্রকাশ বা প্রচার করা কপিরাইট আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

কালিকাপুর পশ্চিম রেলক্রসিংয়ে ভাঙা ব্যারিয়ার, ঝুঁকিতে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথ গেটম্যান নেই, নিরাপত্তা ব্যবস্থা অকার্যকর—আরেকটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার আশঙ্কা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পঠন-পাঠন ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বিশিষ্টজনেরা বলেন, একজন আদর্শ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকই পারেন একটি আদর্শ বিদ্যালয় গড়ে তুলতে।

শিক্ষকের চেয়ার বসে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব কাম্য নয়; একজন আদর্শ শিক্ষক পারেন আদর্শ স্কুল গড়তে

Update Time : ০৮:২১:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬

মোঃ হাসানুর জামান বাবুঃ শিক্ষা, শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শব্দগুলোর সম্পর্ক নিবিড়। একটি ছাড়া আরেকটি অচল। শিক্ষকের অর্বতমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলে না। আবার উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশহীন স্কুলে ভালো শিক্ষক তার মেধা ও মননের বিকাশ ঘটাতে পারে না।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছে পরিবর্তন, লেগেছে যুগের হাওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই আধুনিক শিক্ষা আর পরিবর্তনটা কি শুধু অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর ব্যবসায়িক মনোভাবকেই বাড়িয়েছে? বাড়ায়নি কি মানসম্মত আর আদর্শ শিক্ষার হার? উত্তরটা হবে বেড়েছে দুটোই। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে সুনাম অর্জন করে, তেমনি শিক্ষকতার মহান পেশায় যারা জড়িত থাকেন তাদের আমাদের সমাজের সব পর্যায়ের লোক সম্মান করেন। আমাদের এ সমাজ, সেসব মহান পেশার ব্যক্তিকে শিক্ষক হিসাবে, ওস্তাদ নামে সম্বোধন করেন থাকে।আবার উনারা যখন শিক্ষকতার এই মহান পেশার একটি চেয়ার বসে একটি নিদিষ্ট রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পরিচালনা করেন,ক্লাসে বিষয় ভিত্তিক শ্রেণী কার্যক্রমের বাহিরে নিজ দলের নীতি আদর্শ গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করেন,তখন ঐ শিক্ষকের প্রতি আস্তে আস্তে এলাকার মানুষের সার্বজনীন সম্মান শ্রদ্ধা ভালোবাসা ওস্তাদ বলে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সম্মান উল্টো ঘৃণা ধিক্কার সমালোচনায় পরিনত হয়ে উঠে। কারণ রাজনীতি নিজের ব্যক্তিগত বিষয় এবং গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতি করা নাগরিক অধিকার।
কিন্তু প্রশ্ন হলো আমাদের সন্তানদের আমরা বুকভরা ভরসা নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাই ওস্তাদের হাতে বহুমুখী প্রতিভাবান হয়ে একজন দেশের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এবং স্কুলের শিক্ষকের ও অভিভাবকে এর মুখ উজ্জ্বল করতে; আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কাজ থেকে রাজনৈতিক দলের দীক্ষা নেওয়ার জন্য এতো টাকা পয়সা খরচ করে বেতন ভাতা ফি দিয়ে স্কুলে ভর্তি করাই না।এখন ভর্তির পর যখন দেখি আমাদের সকলের সম্মানে পাত্র ওস্তাদ যখন পাঠ্যবইয়ের মৌলিক বিষয় বাদ উনার নিজের রাজনীতির দলের নীতি আদর্শ গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করেন, তখন স্বাভাবিক ভাবেই শিক্ষকের প্রতি ঘৃণা অশ্রদ্ধা অশ্লীল বাক্য ছুঁড়ে দিতে আমরা অভিভাবকরা এক মিনিট চিন্তা করিনা। কারণ জাতির মেরুদণ্ড একজন শিক্ষক যখন নিজের নীতি আদর্শ সম্মান শ্রদ্ধা ভালোবাসা ওস্তাদ হিসেবে নীতি নৈতিকতা বুঝতে সক্ষম নয়,এবং নিজের পেশার মর্যাদা নিজেই বুঝতে পারেন না। তাহলে আমরা উনাকে আর এতো সম্মান শ্রদ্ধা ভালোবাসা দিয়ে ওস্তাদ বানিয়ে মাথায় তুলে রেখে কি লাভ⁉️
কথা গুলো এইজন্যই বলতে বাধ্য হলাম এই জন্য যে আমাদের চট্টগ্রাম পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কিছু সম্মানিত শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধান শ্রেনী কক্ষে ক্লাস টাইমে ছাত্রদের একটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের দীক্ষা দিচ্ছেন! সম্প্রতি এমন কিছু ছবি ভিডিও দেখে আমি রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম!! যেখানে সরকারি বেতনভুক্ত জনগণের টেক্স এর টাকায় বেতন ভাতা নেওয়া কোন কর্মকর্তা শিক্ষক শিক্ষিকা কর্মচারী কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে অংশ গ্রহণ প্রচার প্রচরণা চালানো সুস্পষ্ট চাকুরীবিধি লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ঠিক সেই সময় সেই পরিস্থিতিতে কিভাবে আমাদের এলাকায় খোদ ক্লাস রুমে ক্লাস চলাকালীন সময়ে সরাসরি রাজনৈতিক দলের দীক্ষা দেওয়া ও কার্যক্রম পরিচালনা করার মতো সাহস কিভাবে করেন উনারা ⁉️ উনারা কি তাহলে বর্তমান সরকারের সকল নিয়ম নীতি আদর্শের বাহিরে? উনারা কি তাহলে সরকারকে এবং সরকারি বেসরকারি চাকুরী বিধি মানের না⁉️যদি সত্যি তাই হয়ে থাকে তাহলে আসলেই উনাদের খুঁটির জোর কোথায়? আজকে আর বেশি লিখবো না যেহেতু অনেক ডকুমেন্টস ইতিমধ্যে আমার হাতে এসেছে পরবর্তীতে একদিন বিস্তারিত তথ্য প্রমাণ সহ লিখবো।
তবে দুঃখ জনক হলেও সত্য এইসব শিক্ষকদের মধ্যে থেকে একজন প্রধান শিক্ষক ও একজন সিনিয়র শিক্ষককে চট্টগ্রাম-১২ পটিয়া নির্বাচনী এলাকার মাননীয় সংসদ সদস্য জননেতা আলহাজ্ব এনামুল হক এনাম সাহেব ইতিমধ্যে পরোক্ষভাবে দুইবার সতর্ক করেছেন এবং পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয় ও পরিচালনা কমিটির সভাপতির মাধ্যমে উনাদের সতর্ক করেছেন। কিছু উনাদের হাত এতোটাই লম্বা যে, কথাবার্তায় মনে হয় উনারা প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও শক্তিশালী।যাই হোক আজকে এই দিকে আর যাবোনা।

আমাদের ব্যাক্তি-রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শিক্ষার গুরুত্ব অনেক। ধর্মীয়ভাবেও রয়েছে শিক্ষার অপরিসীম গুরুত্ব । সেই গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিতে প্রয়োজন ভালো এবং মেধাসম্পন্ন শিক্ষক। আর আদর্শ শিক্ষকের ক্ষেত্র তৈরিতে দরকার ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এখানে শিক্ষা ও শিক্ষক শব্দ দুটি একটি অপরটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। মূল কথা হচ্ছে, শিক্ষাই আলো, শিক্ষাই জাতির মেরুদ-, শিক্ষা ছাড়া সব মত-পথ অন্ধকার। একটি কথা উল্লেখযোগ্য যে, প্রকৃত এবং আদর্শ শিক্ষাগ্রহণ করতে হলে আদর্শবান, ভালো শিক্ষক ছাড়া তা অসম্ভব।

শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। শিক্ষকতার উদ্দেশ্য জ্ঞানের বিকাশ ঘটানো, মনুষ্যত্বকে ফুটিয়ে তোলা, একজন শিক্ষার্থীকে সঠিক পাঠদানের মাধ্যমে তাকে আদর্শবান করে গড়ে তোলা। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্য বইয়ের নয়, এর বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ে যেমনÑনৈতিক শিক্ষা, চেতনা, দেশপ্রেম, মা-বাবা ও পরিবার ও সামাজিকতা শিক্ষাসহ অনেক বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। একজন শিক্ষক হচ্ছেন জাতি গঠন করার কারিগর। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর জন্য হবেন মডেল। শিক্ষকতা পেশাকে কেবলমাত্র চাকরি বা অর্থ উপাজর্নের মাধ্যম নয়, মহান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করবেন এবং তা আন্তরিকতার সঙ্গে অনেকটা নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দেবেন তার মেধা-মননে। শিক্ষাদানের কৌশল হিসেবে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবেন, যাতে তার মেধার সব পর্যায় বিকাশ হয়। একজন সঠিক লক্ষ্যধারী স্বপ্নবাজ শিক্ষক নিজে স্বপ্ন দেখবেন সঙ্গে তার শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখাবেন। সত্যি বলতে একজন আদর্শ ও ভালো শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীর সার্বক্ষণিক অভিভাবক। তিনি আদেশ, উপদেশ, শাসন আর বন্ধুত্ব সুলভ আচরণে চমৎকার সম্পর্ককে শানিত করবেন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। আর এভাবেই শিক্ষার্থীর মঙ্গলের সঙ্গেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে আদর্শ, শিক্ষক হবেন উত্তম আদর্শবান। একজন অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকের এটাই চাওয়া।

‘কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের সহজ-সরল ভাষায় সুন্দর বাচনভঙ্গি ও উপস্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া উচিত। ভালো শিক্ষকের নির্দিষ্ট কয়েকটি গুণ রয়েছে, যেমনÑ১. শিক্ষাদানে সবসময় প্রস্তুত থাকেন, ২. সবসময় পড়াশোনার মধ্যে থাকেন, ৩. সব ধরনের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে চলেন, ৪. ছাত্রছাত্রীদের সত্য ও আদর্শের পথে চালিত করেন, ৫. ছাত্রছাত্রীদের ভালো কাজে উৎসাহ দিয়ে থাকেন, ৬. ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আন্তরিক বন্ধন তৈরি করেন, ৭. আনন্দের সঙ্গে পড়ান।’ (সংগৃহীত)

যখন একজন শিক্ষক এসব আদর্শকে অর্থের কাছে বিকিয়ে দিয়ে শিক্ষাকে বাণিজ্যিক চিন্তার ভেতর ঢুকিয়ে দেন তখন শিক্ষা আর আদর্শকে ধরে রাখতে পারে না। শিক্ষক হয়ে পড়েন লোভী, শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তখন সে নামধারী ভালো-আদর্শ থেকে মেধা-মননের বিকাশ আশা করা বোকামি। তারপরও আমাদের সমাজে সেই শিক্ষা ব্যবস্থাতেই আমাদের অভিভাবক অন্ধমোহে ছুটছেন সন্তানকে নিয়ে নোংরা প্রতিযোগিতায়, যেখানে ভবিষ্যৎ আলোর বদলে আঁধারকেই উসকে দিচ্ছে কতিপয় স্বার্থান্বেষীর অসৎ উদ্দেশ্যে। যা কখনো কাম্য নয়। আমরা নিজেদের অবস্থান থেকে শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে এই শিক্ষা বাণিজ্য থেকে বেরিয়ে আসি এবং সবাই মেধার মূল্যায়ন, আদর্শ ও নৈতিকতার চর্চা অব্যাহত রাখি।

একজন আদর্শ শিক্ষক তিনিই, শিক্ষাকে যিনি পূর্ণতা দেন, যিনি ভালো শিক্ষা দেন। সে কারণে যিনি শিক্ষকতার মতো মহৎ পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেন তিনি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। শিক্ষাদান একটি মহৎ শিল্প। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকই এই শিল্পের মাধ্যম ও কারিগর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় গুণসম্পন্ন একজন শিক্ষক দেশ ও সমাজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তেমনি সব বিষয়ে শিক্ষাবান্ধব স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদ। আর এসব সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে শিক্ষকদের চাহিদা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে উন্নত ও মানসম্মত করতে সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়ন জরুরি। পরিশেষে বলা যায়, একজন আদর্শ-ভালো শিক্ষক কেবল শিক্ষার্থীকেই নয় একটি স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।

লেখক:- মিডিয়া কর্মী ক্রীড়া সংগঠক ও সাবেক একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্য।