০৩:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একটি বিদ্যালয়ের ইতিহাসে যে নাম অনির্বাণ শ্রীমন্তপুর এম. এ. ছাত্তার উচ্চবিদ্যালয়ের প্রাণপুরুষ প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশিদ স্যার

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:২১:১২ অপরাহ্ন, রোববার, ২ আগস্ট ২০২৬
  • ৩০২০ বার পঠিত হয়েছে

মোঃ শাহজাহান বাশার

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে কিছু মানুষের নাম সময়ের সীমানা অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। তাঁদের অবদান কোনো পদবি, কোনো দায়িত্ব কিংবা কোনো সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে, সহকর্মীদের শ্রদ্ধায় এবং একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইট-পাথরের নীরব সাক্ষ্যে। কুমিল্লা জেলার বাকশিমুল ইউনিয়নের শ্রীমন্তপুর গ্রামের শ্রীমন্তপুর এম. এ. ছাত্তার উচ্চবিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমনই এক অনন্য নাম—প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশিদ।

১৯৯৩ সাল। সদ্য প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলা একটি বিদ্যালয়কে সুসংগঠিত ও আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে আসেন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আব্দুস ছাত্তার খাঁন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেই স্বপ্নযাত্রায় শামিল হন আব্দুর রশিদ। একটি বিদ্যালয়কে শুধু পরিচালনা নয়, বরং একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলার মহৎ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি।

১৯৯৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা আঠারো বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি যে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা আজও বিদ্যালয়ের ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। সীমিত অবকাঠামো, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি কখনো আপস করেননি শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা এবং নৈতিকতার প্রশ্নে। তাঁর কাছে বিদ্যালয় ছিল শুধু পাঠদানের একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি ছিল মানুষ গড়ার এক পবিত্র অঙ্গন।

শিক্ষার্থীদের কাছে আব্দুর রশিদ ছিলেন কঠোর শৃঙ্খলার প্রতীক। কিন্তু সেই কঠোরতার অন্তরালে ছিল একজন স্নেহময় অভিভাবকের হৃদয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন শিক্ষক তখনই সফল হন, যখন তাঁর শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

তাঁর শ্রেণিকক্ষে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শেখানো হতো সততা, সময়ানুবর্তিতা, আত্মসম্মান, দেশপ্রেম এবং মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা। তিনি জানতেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শ্রেণিকক্ষের ওপর। তাই প্রতিটি শিক্ষার্থীকে তিনি দেখতেন সম্ভাবনাময় একজন মানুষ হিসেবে।

আজ শ্রীমন্তপুর এম. এ. ছাত্তার উচ্চবিদ্যালয়ের অসংখ্য প্রাক্তন শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁদের অনেকেই স্বীকার করেন, তাঁদের জীবনের ভিত্তি নির্মাণে আব্দুর রশিদের শিক্ষা, শাসন, উৎসাহ এবং মূল্যবোধের প্রভাব গভীরভাবে কাজ করেছে। একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত কোনো পুরস্কার নয়; বরং তাঁর শিক্ষার্থীদের সাফল্যই তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ সম্মান।

একটি বিদ্যালয়কে বড় করে তোলে শুধু ভবন নয়, বড় করে তোলে কিছু মানুষের আদর্শ। আব্দুর রশিদ ছিলেন সেই আদর্শের অন্যতম নির্মাতা। তিনি প্রচারের আলোয় আসার চেষ্টা করেননি; বরং নিরবে, নিষ্ঠার সঙ্গে এবং আত্মমর্যাদা বজায় রেখে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কর্মজীবন প্রমাণ করে, একজন আদর্শ শিক্ষক একটি প্রতিষ্ঠানের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।

আজ যখন শ্রীমন্তপুর এম. এ. ছাত্তার উচ্চবিদ্যালয়ের ইতিহাসের পাতা উল্টানো হয়, তখন শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় তাঁর নাম। কারণ তিনি শুধু একজন প্রধান শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি স্বপ্নের রূপকার, একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি নির্মাতাদের একজন এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনের পথপ্রদর্শক।

সময়ের প্রবাহে প্রজন্ম বদলাবে, নতুন শিক্ষক আসবেন, নতুন শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের আঙিনায় পদচারণা করবে। কিন্তু কিছু নাম কখনো মুছে যায় না। আব্দুর রশিদ সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁদের অবদান প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

শ্রীমন্তপুর এম. এ. ছাত্তার উচ্চবিদ্যালয়ের ইতিহাস লেখা হলে, সেখানে একটি অধ্যায়ের শিরোনাম নিঃসন্দেহে হবে—”আব্দুর রশিদ: একজন শিক্ষক, যিনি একটি প্রজন্মকে গড়ে তুলেছিলেন।”

সতর্কতাঃ এই ওয়েবসাইটে নিজস্ব সংবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম থেকে সূত্র উল্লেখপূর্বক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত কোনো সংবাদের বিষয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে অনুগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট মূল সংবাদমাধ্যমের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও ও অন্যান্য কনটেন্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, অনুলিপি, পুনঃপ্রকাশ বা প্রচার করা কপিরাইট আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

দুবাইয়ে জামিন পেলেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, দেশত্যাগে বহাল নিষেধাজ্ঞা

একটি বিদ্যালয়ের ইতিহাসে যে নাম অনির্বাণ শ্রীমন্তপুর এম. এ. ছাত্তার উচ্চবিদ্যালয়ের প্রাণপুরুষ প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশিদ স্যার

Update Time : ১২:২১:১২ অপরাহ্ন, রোববার, ২ আগস্ট ২০২৬

মোঃ শাহজাহান বাশার

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে কিছু মানুষের নাম সময়ের সীমানা অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। তাঁদের অবদান কোনো পদবি, কোনো দায়িত্ব কিংবা কোনো সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে, সহকর্মীদের শ্রদ্ধায় এবং একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইট-পাথরের নীরব সাক্ষ্যে। কুমিল্লা জেলার বাকশিমুল ইউনিয়নের শ্রীমন্তপুর গ্রামের শ্রীমন্তপুর এম. এ. ছাত্তার উচ্চবিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমনই এক অনন্য নাম—প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশিদ।

১৯৯৩ সাল। সদ্য প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলা একটি বিদ্যালয়কে সুসংগঠিত ও আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে আসেন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আব্দুস ছাত্তার খাঁন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেই স্বপ্নযাত্রায় শামিল হন আব্দুর রশিদ। একটি বিদ্যালয়কে শুধু পরিচালনা নয়, বরং একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলার মহৎ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি।

১৯৯৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা আঠারো বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি যে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা আজও বিদ্যালয়ের ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। সীমিত অবকাঠামো, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি কখনো আপস করেননি শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা এবং নৈতিকতার প্রশ্নে। তাঁর কাছে বিদ্যালয় ছিল শুধু পাঠদানের একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি ছিল মানুষ গড়ার এক পবিত্র অঙ্গন।

শিক্ষার্থীদের কাছে আব্দুর রশিদ ছিলেন কঠোর শৃঙ্খলার প্রতীক। কিন্তু সেই কঠোরতার অন্তরালে ছিল একজন স্নেহময় অভিভাবকের হৃদয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন শিক্ষক তখনই সফল হন, যখন তাঁর শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

তাঁর শ্রেণিকক্ষে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শেখানো হতো সততা, সময়ানুবর্তিতা, আত্মসম্মান, দেশপ্রেম এবং মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা। তিনি জানতেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শ্রেণিকক্ষের ওপর। তাই প্রতিটি শিক্ষার্থীকে তিনি দেখতেন সম্ভাবনাময় একজন মানুষ হিসেবে।

আজ শ্রীমন্তপুর এম. এ. ছাত্তার উচ্চবিদ্যালয়ের অসংখ্য প্রাক্তন শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁদের অনেকেই স্বীকার করেন, তাঁদের জীবনের ভিত্তি নির্মাণে আব্দুর রশিদের শিক্ষা, শাসন, উৎসাহ এবং মূল্যবোধের প্রভাব গভীরভাবে কাজ করেছে। একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত কোনো পুরস্কার নয়; বরং তাঁর শিক্ষার্থীদের সাফল্যই তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ সম্মান।

একটি বিদ্যালয়কে বড় করে তোলে শুধু ভবন নয়, বড় করে তোলে কিছু মানুষের আদর্শ। আব্দুর রশিদ ছিলেন সেই আদর্শের অন্যতম নির্মাতা। তিনি প্রচারের আলোয় আসার চেষ্টা করেননি; বরং নিরবে, নিষ্ঠার সঙ্গে এবং আত্মমর্যাদা বজায় রেখে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কর্মজীবন প্রমাণ করে, একজন আদর্শ শিক্ষক একটি প্রতিষ্ঠানের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।

আজ যখন শ্রীমন্তপুর এম. এ. ছাত্তার উচ্চবিদ্যালয়ের ইতিহাসের পাতা উল্টানো হয়, তখন শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় তাঁর নাম। কারণ তিনি শুধু একজন প্রধান শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি স্বপ্নের রূপকার, একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি নির্মাতাদের একজন এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনের পথপ্রদর্শক।

সময়ের প্রবাহে প্রজন্ম বদলাবে, নতুন শিক্ষক আসবেন, নতুন শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের আঙিনায় পদচারণা করবে। কিন্তু কিছু নাম কখনো মুছে যায় না। আব্দুর রশিদ সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁদের অবদান প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

শ্রীমন্তপুর এম. এ. ছাত্তার উচ্চবিদ্যালয়ের ইতিহাস লেখা হলে, সেখানে একটি অধ্যায়ের শিরোনাম নিঃসন্দেহে হবে—”আব্দুর রশিদ: একজন শিক্ষক, যিনি একটি প্রজন্মকে গড়ে তুলেছিলেন।”