মোঃ শাহজাহান বাশার
মানুষের জীবনে হারিয়ে যাওয়ার গল্প অনেক, কিন্তু সেই হারানোর মধ্যেও নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্পই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের পথে চলতে গিয়ে আমরা কখনো হারাই প্রিয় মানুষ, কখনো হারাই বিশ্বাস, কখনো ভেঙে যায় দীর্ঘদিনের সাজানো স্বপ্ন। আবার কখনো এমন কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়, যা আমাদের ভেতর থেকে বদলে দেয়। তবু সব হারানোর পরও যদি নিজের আত্মমর্যাদা, সততা ও মানবিকতাকে ধরে রাখা যায়, তবে সেই জীবনকে পরাজিত বলা যায় না।
জীবনের একটি পর্যায়ে এসে মানুষ বুঝতে শেখে, সব সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের মর্যাদা ধরে রাখতে পারে না, সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবতার পরীক্ষায় টিকে থাকে না, আর যাদের সবচেয়ে আপন মনে করা হয়, তারাই সব সময় প্রত্যাশার জায়গায় দাঁড়াতে পারে না। জীবনের কঠিন সত্যগুলো মানুষ বই পড়ে যতটা না শেখে, তার চেয়ে বেশি শেখে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি হয়, মানুষের মুখের ভাষা আর মনের ভাষা এক নয়; প্রতিশ্রুতি আর দায়িত্ব এক নয়; আর কাউকে আপন ভাবা মানেই তার কাছে নিরাপদ থাকা নয়।
আমরা প্রত্যেকেই জীবনে কিছু প্রত্যাশা নিয়ে পথ চলি। কেউ চায় ভালোবাসা, কেউ চায় সম্মান, কেউ চায় নিরাপত্তা, আবার কেউ চায় এমন কিছু মানুষ, যাদের কাছে নির্দ্বিধায় নিজের সুখ-দুঃখের কথা বলা যায়। আমার চাওয়াও কখনো খুব বেশি ছিল না। যাদের আপন ভেবে পাশে দাঁড়িয়েছি, তাদের কাছ থেকে চেয়েছি সামান্য আন্তরিকতা, বিপদের দিনে একটু সহযোগিতা এবং সম্পর্কের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা অনেক সময় মানুষের সেই সাধারণ প্রত্যাশাগুলোকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়।
কখনো কারও বিপদে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়িয়েছি, কখনো কারও মুখে হাসি ফোটাতে নিজের কষ্ট আড়াল করেছি, আবার কখনো কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা ছাড়াই মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছি। ভেবেছি, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য। কিন্তু সব মানুষ সেই সৌন্দর্যের অর্থ বোঝে না। কেউ সহযোগিতাকে ভালোবাসা মনে করে, কেউ সুযোগ হিসেবে নেয়। কেউ সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করে, আবার কেউ প্রয়োজন শেষ হলে সম্পর্কের দায়টুকুও অস্বীকার করে।
এমন অভিজ্ঞতার পর মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—ভুলটা কোথায় ছিল? মানুষের পাশে দাঁড়ানো কি ভুল ছিল, নাকি ভুল ছিল মানুষকে চিনতে না পারা? বিশ্বাস করাটা কি অপরাধ, নাকি বিশ্বাসের যোগ্যতা যাচাই না করেই কাউকে নিজের জীবনে অতিরিক্ত জায়গা দিয়ে দেওয়া ছিল ভুল?
আমি মনে করি, মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখা কোনো অপরাধ নয়। বরং বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতাই একটি সুস্থ সমাজের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু বিশ্বাসের সঙ্গে বিবেচনাবোধ না থাকলে সেই বিশ্বাসই কখনো কখনো মানুষের দুর্বলতার কারণ হয়ে ওঠে। তাই জীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, ভালো মানুষ হওয়া জরুরি, তবে একই সঙ্গে সচেতন মানুষ হওয়াও সমান জরুরি।
সম্পর্কের ভাঙন মানুষকে যা শেখায়
একটি সম্পর্ক ভেঙে গেলে শুধু দুজন মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় না; কখনো কখনো ভেঙে যায় একজন মানুষের নিজের সম্পর্কে গড়ে তোলা অনেক ধারণাও। যে মানুষটি একসময় মনে করত, ভালোবাসা দিয়ে সব দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়া সম্ভব, সে একসময় বুঝতে পারে, সব দূরত্ব ভালোবাসা দিয়ে মুছে ফেলা যায় না। যে মানুষটি বিশ্বাস করত, আন্তরিকতা দিয়ে প্রতিটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায়, সে উপলব্ধি করে, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব একা একজনের নয়।
সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংকট তখনই তৈরি হয়, যখন একজন মানুষ বারবার চেষ্টা করে, অথচ অন্যজন সেই চেষ্টার মূল্য দিতে চায় না। একজন নিজের সময়, আবেগ ও সামর্থ্য ব্যয় করে সম্পর্কটিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে, অন্যজন হয়তো সেই প্রচেষ্টাকে স্বাভাবিক ধরে নেয়। একজন কষ্ট পেয়েও সম্পর্কের কথা চিন্তা করে, অন্যজন নিজের সুবিধা অনুযায়ী দূরে সরে যায়। এভাবে একসময় সম্পর্কের ভেতরে ভারসাম্য হারিয়ে যায়।
কিন্তু সম্পর্ক রক্ষা করার নামে নিজের আত্মসম্মানকে প্রতিনিয়ত আঘাত করা কোনো সুস্থ সমাধান নয়। কাউকে ধরে রাখার জন্য নিজের মূল্যবোধ বিসর্জন দিতে হলে, নিজের অনুভূতিকে বারবার অস্বীকার করতে হলে কিংবা প্রতিনিয়ত অবহেলা সহ্য করতে হলে, সেই সম্পর্কের বাস্তবতা নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।
সব সম্পর্ক ধরে রাখতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিছু সম্পর্ককে সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানানোও জীবনের পরিণত সিদ্ধান্তের অংশ। কারণ, কাউকে হারানোর ভয় যেন নিজের অস্তিত্ব হারানোর কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্বাসভঙ্গের পরও মানুষ কেন ভালো থাকতে চায়?
যে মানুষ অন্যের কাছ থেকে আঘাত পায়, তার সামনে সাধারণত দুটি পথ খোলা থাকে। একটি হলো সেই আঘাতের প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তায় নিজের জীবনকে আবদ্ধ করে রাখা। অন্যটি হলো অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের জীবনকে নতুনভাবে সাজানো। প্রথম পথটি সাময়িক তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু দ্বিতীয় পথ মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করে।
কেউ আমার সঙ্গে অন্যায় করেছে বলেই আমাকেও অন্যায় করতে হবে—এমন চিন্তা আত্মমর্যাদার পরিচয় নয়। বরং অন্যের অন্যায়কে নিজের চরিত্রের অংশ হতে না দেওয়াই প্রকৃত শক্তি। কেউ আমাকে কষ্ট দিয়েছে বলে আমি অন্যের কষ্টের কারণ হব, কেউ আমার বিশ্বাস ভেঙেছে বলে আমি সবার বিশ্বাস ভাঙব—এমন সিদ্ধান্ত নিলে শেষ পর্যন্ত অন্যের ভুলের শাস্তি নিজের জীবনকেই দিতে হয়।
আমার বিশ্বাস, মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন তখনই, যখন সে নিজের কষ্টের অভিজ্ঞতাকে অন্যের প্রতি সহমর্মিতায় রূপান্তর করতে পারে। যে মানুষ নিজে অবহেলিত হয়েছে, সে যেন অন্যকে অবহেলা না করে। যে মানুষ বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা অনুভব করেছে, সে যেন অন্যের বিশ্বাস নিয়ে খেলা না করে। যে মানুষ একাকিত্বের কষ্ট জানে, সে যেন বিপদে পড়া কাউকে অকারণে একা ফেলে না যায়।
নিজের কষ্টকে মানবিকতার শক্তিতে পরিণত করতে পারাই জীবনের অন্যতম বড় শিক্ষা। কারণ, জীবনে কী হারিয়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ—হারানোর পর আমি কেমন মানুষ হয়ে উঠেছি।
আত্মমর্যাদা মানে অহংকার নয়
আমাদের সমাজে আত্মমর্যাদা নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। কেউ নিজের অধিকারের কথা বললে তাকে অহংকারী বলা হয়, কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তাকে কঠিন মনের মানুষ ভাবা হয়, আবার কেউ অসম্মানজনক সম্পর্ক থেকে সরে এলে বলা হয়, সে সম্পর্কের মূল্য দিতে জানে না। অথচ আত্মমর্যাদা আর অহংকার সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
অহংকার মানুষকে অন্যের চেয়ে বড় হতে শেখায়, আর আত্মমর্যাদা মানুষকে নিজের মূল্য বুঝতে শেখায়। অহংকারী মানুষ অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় প্রমাণ করতে চায়; আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ কাউকে ছোট না করেই নিজের অবস্থান ধরে রাখতে জানে। আত্মমর্যাদা মানে সবাইকে দূরে ঠেলে দেওয়া নয়, বরং নিজের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন থাকা।
কেউ আমার সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করলে তার প্রতিবাদ করা আমার অধিকার। কেউ আমার সরলতাকে ব্যবহার করতে চাইলে তাকে না বলা আমার দায়িত্ব। কেউ বারবার আমার বিশ্বাস ভেঙে দিলে তার কাছ থেকে দূরত্ব তৈরি করা আমার বিবেচনাবোধের পরিচয়। এসব সিদ্ধান্তের জন্য কাউকে ঘৃণা করতে হবে না, কাউকে অপমানও করতে হবে না। কখনো কখনো নীরবে সরে আসাই সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ উত্তর।
আত্মমর্যাদা রক্ষা করার জন্য সব সময় উচ্চস্বরে কথা বলতে হয় না। কখনো নিজের অবস্থানে স্থির থাকা, কখনো অপ্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা না দেওয়া, কখনো ভুল সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা—এসবও আত্মসম্মানের প্রকাশ। পৃথিবীর সবাই আমার সিদ্ধান্ত বুঝবে না, সবাই আমার অবস্থানকে সমর্থনও করবে না। কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকা এবং নিজের মর্যাদা রক্ষা করা আমারই দায়িত্ব।
মানুষের পরিচয় প্রকাশ পায় দুঃসময়ে
সুসময়ে মানুষের অভাব হয় না। সাফল্যের সময় অনেকেই কাছে আসে, আনন্দের মুহূর্তে অনেকেই শুভেচ্ছা জানায়, আর জীবনে যখন সামর্থ্য ও প্রভাব থাকে, তখন চারপাশে মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ে। কিন্তু প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তখনই, যখন জীবনের আকাশে দুর্যোগ নেমে আসে।
দুঃসময়ে কেউ পাশে দাঁড়ায়, কেউ সাহস জোগায়, কেউ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করে। আবার কেউ দূরত্ব তৈরি করে, কেউ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়, কেউ এমন আচরণ করে যেন কখনো কোনো সম্পর্কই ছিল না। এই অভিজ্ঞতাগুলো কষ্টদায়ক হলেও মানুষকে সম্পর্কের বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—সবাই একইভাবে সহযোগিতা করতে পারে না। কারও ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্য থাকে না, কেউ নিজেও সংকটের মধ্যে থাকে, আবার কেউ হয়তো কীভাবে পাশে দাঁড়াতে হয় তা জানে না। তাই কারও অনুপস্থিতিকে সব সময় প্রতারণা হিসেবে দেখা উচিত নয়। মানুষের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু যেখানে বারবার স্বার্থপরতা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, অসম্মান ও ইচ্ছাকৃত অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়, সেখানে নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করাও জরুরি।
মানুষকে বুঝতে শেখা মানে সবাইকে সন্দেহ করা নয়; বরং আবেগের পাশাপাশি বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দেওয়া। কাউকে একদিনের আচরণ দিয়ে বিচার না করে সময়ের ধারাবাহিকতায় তার চরিত্র বোঝার চেষ্টা করাই বিচক্ষণতা।
হারানোর বেদনা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর শিক্ষা
জীবনের কিছু হারানো সহজে মেনে নেওয়া যায় না। কোনো সম্পর্কের সমাপ্তি, দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ভেঙে যাওয়া, প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়া কিংবা প্রিয় কোনো মানুষের দূরে সরে যাওয়া—এসব অভিজ্ঞতা মানুষের ভেতরে গভীর শূন্যতা তৈরি করতে পারে। কখনো সেই শূন্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগে, কখনো প্রয়োজন হয় নিজের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপের।
কিন্তু জীবন কোনো একটি ঘটনা কিংবা একটি সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি দরজা বন্ধ হয়ে গেলে সব পথ বন্ধ হয়ে যায় না। একটি সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলে মানুষের ভালোবাসার সামর্থ্য শেষ হয়ে যায় না। একটি সুযোগ হারিয়ে গেলে জীবনের সব সম্ভাবনাও হারিয়ে যায় না।
ঘুরে দাঁড়ানোর প্রথম শর্ত হলো বাস্তবতাকে স্বীকার করা। যা হারিয়ে গেছে, তা হয়তো আগের মতো ফিরবে না। যে মানুষটি চলে গেছে, সে হয়তো আর ফিরে আসবে না। যে সময়টি নষ্ট হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব। নিজের ভুল থাকলে তা স্বীকার করা সম্ভব, অন্যের ভুল থেকে দূরত্ব তৈরি করা সম্ভব, আর ভবিষ্যতের জন্য আরও সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
দ্বিতীয় শর্ত হলো নিজের জীবনকে আবার গুরুত্ব দেওয়া। অন্যকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজের স্বপ্ন, দায়িত্ব, স্বাস্থ্য, পরিবার ও মানসিক শান্তিকে অবহেলা করা উচিত নয়। নিজের দক্ষতা বাড়ানো, কর্মজীবনে মনোযোগ দেওয়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, ভালো মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে মনের কথা ভাগ করে নেওয়া—এসব ছোট ছোট পদক্ষেপ মানুষকে ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে সাহায্য করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের মূল্য অন্যের আচরণের ওপর নির্ভরশীল করে না তোলা। কেউ আমাকে গুরুত্ব দেয়নি বলে আমি মূল্যহীন হয়ে যাই না। কেউ আমার ভালোবাসার প্রতিদান দেয়নি বলে আমার আন্তরিকতা মিথ্যা হয়ে যায় না। কেউ আমার পাশে দাঁড়ায়নি বলে আমার পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা নেই—এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়।
অন্যের আচরণ তার মানসিকতা ও সিদ্ধান্তের পরিচয় বহন করে; সেটিই আমার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়।
পেশাগত জীবনে ন্যায়বোধ ও ব্যক্তিগত জীবনে প্রজ্ঞা
আইনজীবী হিসেবে ন্যায়বিচার, অধিকার ও দায়িত্বের প্রশ্ন আমাদের ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আইনের দৃষ্টিতে যেমন অভিযোগ, প্রমাণ, যুক্তি ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও কোনো মানুষ বা পরিস্থিতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আবেগের পাশাপাশি তথ্য ও বাস্তবতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জীবনের প্রতিটি বিরোধ আদালতে গড়ায় না, প্রতিটি অন্যায়ের প্রতিকারও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা, ভুল বোঝাবুঝি দূর করার চেষ্টা করা, প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ মানুষের পরামর্শ নেওয়া এবং নিজের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। আবেগের বশবর্তী হয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
ন্যায়বোধের অর্থ শুধু অন্যের ভুল খুঁজে বের করা নয়; নিজের সিদ্ধান্ত ও আচরণকেও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো। আমি কোথায় ভুল করেছি, কোথায় অতিরিক্ত প্রত্যাশা করেছি, কোথায় সীমারেখা নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছি—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও আত্মোন্নয়নের অংশ।
তবে নিজের ভুল স্বীকার করার অর্থ অন্যের অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া নয়। নিজের দুর্বলতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, কিন্তু অন্যের প্রতারণার দায় নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া উচিত নয়। আত্মসমালোচনা মানুষকে পরিণত করে, আর অকারণ আত্মদোষারোপ মানুষকে দুর্বল করে। এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারাই প্রজ্ঞার পরিচয়।
ক্ষমা করা যায়, কিন্তু শিক্ষা ভুলে যাওয়া যায় না
জীবনে এমন মানুষ আসতে পারে, যাদের আচরণ গভীর কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের প্রতি ক্ষোভ জমে থাকতে পারে, পুরোনো স্মৃতি বারবার ফিরে আসতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন সেই ক্ষোভ বয়ে বেড়ালে নিজের শান্তিই নষ্ট হয়। তাই নিজের মানসিক শান্তির জন্য কখনো কখনো ক্ষমা করে দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
তবে ক্ষমা করার অর্থ এই নয় যে, আগের মতো সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতেই হবে। কাউকে ক্ষমা করা আর তাকে আবার একই মাত্রায় বিশ্বাস করা এক বিষয় নয়। ক্ষমা অতীতের ক্ষত থেকে মুক্ত হওয়ার পথ হতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন সময়, সততা, দায়িত্বশীলতা এবং আচরণের ধারাবাহিক পরিবর্তন।
কেউ ভুল করলে তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যায়। কিন্তু একই ব্যক্তি বারবার একই আচরণ করলে শুধু প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে নিজের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলা উচিত নয়। কথার চেয়ে কাজকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করা সম্ভব হলেও সেই প্রক্রিয়ায় আন্তরিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে এই শিক্ষাই দেয়—মনের মধ্যে ঘৃণা জমিয়ে রাখা প্রয়োজন নেই, কিন্তু অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করাও উচিত নয়। অতীতকে মনে রাখতে হবে শিক্ষা হিসেবে, শাস্তি হিসেবে নয়।
জীবনের হিসাবের শেষ কথা
মানুষ যখন জীবনের একটি পর্যায়ে এসে পেছনে ফিরে তাকায়, তখন অনেক হিসাব সামনে আসে। কিছু স্বপ্ন পূরণ হয়, কিছু অপূর্ণ থেকে যায়। কিছু মানুষ পাশে থাকে, কিছু মানুষ হারিয়ে যায়। কিছু সিদ্ধান্ত আনন্দ দেয়, আবার কিছু সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জীবনের এই যোগ-বিয়োগের মধ্যে সব হিসাব মেলানো সম্ভব হয় না।
তবু জীবনের সাফল্য কেবল কত সম্পদ অর্জন করেছি, কত মানুষকে নিজের করে রাখতে পেরেছি কিংবা কতবার অন্যের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছি—এসব দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। বরং কতটা সৎ থাকতে পেরেছি, কতটা দায়িত্ব পালন করেছি, কতজন মানুষের উপকারে আসতে পেরেছি, অন্যায়ের সামনে কতটা ন্যায়সংগত অবস্থান নিয়েছি এবং কঠিন সময়েও নিজের বিবেককে কতটা অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছি—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
জীবনে হারানোর গল্প থাকবে, হতাশার মুহূর্ত আসবে, সম্পর্কের ভাঙন ঘটবে। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতা যেন আমাদের ভেতরের ভালো মানুষটিকে ধ্বংস করে না দেয়। যে মানুষ একসময় বিশ্বাস করে আঘাত পেয়েছে, সে যেন ভবিষ্যতে কাউকে অকারণে সন্দেহ করে কষ্ট না দেয়। যে মানুষ অবহেলিত হয়েছে, সে যেন অন্যের প্রতি অবহেলাকে স্বাভাবিক আচরণ মনে না করে। যে মানুষ প্রতারণার শিকার হয়েছে, সে যেন প্রতিশোধের নামে প্রতারণাকেই নিজের পথ হিসেবে বেছে না নেয়।
জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে যদি বলতে পারি—অনেক কষ্ট পেয়েছি, অনেক মানুষ হারিয়েছি, অনেক প্রত্যাশা অপূর্ণ থেকেছে; তবু সততা হারাইনি, আত্মমর্যাদা বিকিয়ে দিইনি, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিনি এবং মানুষের প্রতি আমার মানবিকতা ধরে রেখেছি—তাহলে সেই জীবনকে ব্যর্থ বলার সুযোগ কোথায়?
আমি বিশ্বাস করি, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার হারানোর তালিকায় নয়, বরং হারানোর পরও সে কীভাবে বেঁচে থাকে, কীভাবে নিজেকে গড়ে তোলে এবং অন্যের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার মধ্যেই প্রকাশ পায়।
হারানোর গল্প জীবনের একটি অধ্যায় হতে পারে, কিন্তু সেটিই জীবনের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। যে মানুষ নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়, অন্যের অন্যায় থেকে প্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি করে, আত্মসম্মান রক্ষা করে এবং মানবিকতার আলো নিভতে দেয় না, সে কখনো পুরোপুরি পরাজিত হয় না।
জীবনের পথে আমারও অনেক হিসাব এখনো অসম্পূর্ণ। কিছু প্রশ্নের উত্তর পাইনি, কিছু সম্পর্কের ব্যাখ্যা আজও অজানা। তবু সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় হারাইনি। কারণ, আমি জানি—অতীত বদলানো যায় না, কিন্তু অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে গড়ে তোলা যায়।
আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় জয় হবে, যদি একদিন পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি—যারা আমাকে কষ্ট দিয়েছে, তাদের আচরণ আমার চরিত্রকে কলুষিত করতে পারেনি; যারা আমার বিশ্বাস ভেঙেছে, তারা আমার বিবেককে পরাজিত করতে পারেনি; আর যেসব হারানো আমাকে একসময় নিঃস্ব মনে করিয়েছিল, সেসব অভিজ্ঞতাই আমাকে নিজের মূল্য বুঝতে শিখিয়েছে।
হারানোর গল্প পেরিয়ে আত্মমর্যাদার পথে হাঁটাই হোক আমাদের প্রত্যয়। প্রতিশোধ নয়, প্রজ্ঞা; অহংকার নয়, আত্মসম্মান; অন্ধ বিশ্বাস নয়, বিবেকনির্ভর আস্থা—এই হোক জীবনের নতুন দর্শন। কারণ, দিনশেষে মানুষ কত কিছু হারিয়েছে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সব হারানোর পরও সে নিজের ভেতরের মানুষটিকে কতটা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে।