মোঃ শাহজাহান বাশার
বিশ্বব্যাপী শান্তি, সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ এবং আন্তধর্মীয় সহাবস্থান জোরদারের আহ্বানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ইন্টারন্যাশাল পিস কনফারেন্স-২০২৬’। শনিবার নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জালসা কনভেনশন হলে Sufis & Mainia Youth Forum-এর উদ্যোগে আয়োজিত এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল— ‘Love and Mercy – The Message of All the Prophets (PBUH)’ (ভালোবাসা ও দয়া—সকল নবী-রাসুল (আ.)-এর বার্তা)।
সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত আলেম, সুফি ব্যক্তিত্ব, গবেষক, আন্তধর্মীয় নেতা, শিক্ষাবিদ, কূটনীতিক, সমাজসেবী এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা বলেন, যুদ্ধ, সহিংসতা, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক বিভাজনের এই সময়ে শান্তি, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সম্মেলনের প্রধান অতিথি ও মূল বক্তা ছিলেন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক কেন্দ্র মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের পীর এবং ওয়ার্ল্ড অব সুফিজের প্রেসিডেন্ট ড. শাহ সূফী সায়্যিদ সাইফুদ্দীন আহমেদ আল হাসানী আল মাইজভাণ্ডারী (ম.জি.আ.)। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, বর্তমান বিশ্বে সংঘাত, বিদ্বেষ ও বিভাজনের পরিবর্তে ভালোবাসা, দয়া, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। তিনি বলেন, সব নবী-রাসুল (আ.) মানবকল্যাণ, নৈতিকতা, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক সম্মানবোধের শিক্ষা দিয়েছেন। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে এসব মূল্যবোধের চর্চা একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বিশ্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য বিভেদের কারণ নয়; বরং পারস্পরিক পরিচয়, সহযোগিতা ও মানবকল্যাণে একযোগে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সব ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে বক্তব্য দেন Ahmed Muhaiyudeen, Jonathan Granoff, Sayeed Mashooq Main Al Din Al Hasani, Shaykh Faisal Hamid Abdur-Razak, Sheikha Maryam Kabeer Faye, Allama Sayed Jubayer Ahmed (MJA), Azmain Asrar Maizbhandari, Qari Muhammad Farooq, নিউ জার্সির বিলাল মসজিদের ইমাম ও খতিব, Sayeed Hamza Shah, Mufti Sajjad Raza এবং আন্তধর্মীয় নেতা Michael Shevack।
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, ইসলামসহ সব ঐশী ধর্মের মূল শিক্ষা শান্তি, ন্যায়, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবসেবা। বিশ্বে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের বিকল্প নেই। তাঁরা মানবিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, আন্তধর্মীয় সংলাপ সম্প্রসারণ এবং সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আল্লামা সাইয়্যিদ মুতাওয়াক্কিল বিল্লাহ বাদরপুরী, গিয়াস আহমেদ, আলহাজ মোহাম্মদ সালিম উদ্দিন, মোহাম্মদ লুৎফুল করিম, মোহাম্মদ শামসুদ্দিন আজাদ, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এবং মোশেরেফ হোসাইন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইসলামী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও সম্মেলনে অংশ নেন।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, হামদ ও নাত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে বিশ্বশান্তি, মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা, আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি এবং বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে একাধিক অধিবেশনে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা বিশ্বব্যাপী সংঘাত, ঘৃণা ও বৈষম্য দূর করে শান্তি ও সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সম্মেলনের সমাপনী পর্বে ড. শাহ সূফী সায়্যিদ সাইফুদ্দীন আহমেদ আল হাসানী আল মাইজভাণ্ডারী বিশ্বশান্তি, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, মানবজাতির কল্যাণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন।
আয়োজকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের এক মঞ্চে এনে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলাই এ সম্মেলনের প্রধান লক্ষ্য। তাঁদের আশা, এ ধরনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী শান্তি, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।